লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সম্পত্তি লিখে নিতে এক বৃদ্ধকে ঘরে বন্দি রেখে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে স্ত্রী ও সন্তানদের বিরুদ্ধে। তিনদিন ধরে নির্যাতনের ফলে গুরুতর আহত ওই বৃদ্ধের দুই পা ভেঙে গেছে এবং ঘাড়ে মারাত্মক আঘাত লেগেছে। পরে স্থানীয় সাংবাদিক ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরে রামগতি উপজেলার চর বাদাম ইউনিয়নের চরসীতা গ্রামে। ভুক্তভোগীর নাম মিলন (৪৬)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমি লিখে দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় স্ত্রী, দুই ছেলে ও পুত্রবধূরা মিলে মিলনকে মারধর করে। একপর্যায়ে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টাও করা হয়। পরে তাকে বসতঘরের একটি গোপন কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। টানা তিনদিন চিকিৎসা ছাড়াই অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়।
নির্যাতনের ফলে তার শরীর ফুলে যায় এবং পায়ের ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হতে শুরু করে। তীব্র ব্যথা, ক্ষুধা ও পানির জন্য বারবার আকুতি জানালেও পরিবারের কেউ সাড়া দেয়নি। বরং তারা ঘরের দরজা বন্ধ করে পাশের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে অবস্থান করত।
শনিবার ভোরে গোপনে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে লক্ষ্মীপুরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক্স-রে করার পর চিকিৎসকরা জানান, তার দুই পা-ই ভেঙে গেছে। তবে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে স্ত্রী পান্না আক্তার তাকে সরাসরি একটি ভূমি অফিসে নিয়ে যান জমি রেজিস্ট্রির জন্য। সেখানে কর্মকর্তারা তার শারীরিক অবস্থা দেখে দলিল করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তাকে আবার বাড়িতে এনে আগের মতোই তালাবদ্ধ করে রাখা হয়।
ঘটনার তিনদিন পর রবিবার বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। প্রথমে ঘর তালাবদ্ধ থাকলেও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে একপর্যায়ে দরজা খুলতে বাধ্য হন মিলনের স্ত্রী। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, অন্ধকার কক্ষে প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছেন মিলন।
এসময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, মারধরের সময় স্ত্রীকে পা ধরে বাঁচানোর আকুতি করলেও তিনি উল্টো ছেলেদের আরও মারতে উৎসাহ দেন। জীবনের সবকিছু দিয়ে সন্তানদের জন্য ঘরবাড়ি গড়ে তুললেও এখন তারাই তাকে হত্যা করতে চাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং কাউকে জানাতেও দেওয়া হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে স্ত্রী পান্না বেগম জানান, তার স্বামী পরনারীর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে পারিবারিক বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে ছেলেরা তাকে মারধর করে। তবে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
অন্যদিকে ছেলে সোহাগ বাবাকে মারধরের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা মেরেছি, আমরাই চিকিৎসা করাবো।’
সংবাদ পেয়ে রামগতি থানার এসআই মজিবরের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মিলনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। এসময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্ত দুই ছেলে পালিয়ে যায়।
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান জানান, ভুক্তভোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, সাংবাদিক ও পুলিশ সময়মতো ঘটনাস্থলে না পৌঁছালে ওই বৃদ্ধ হয়তো ঘরেই বিনা চিকিৎসায় মারা যেতেন।


