ঈদের টানা ছুটি মানেই পরিবারকে সময় দেওয়ার বিরল সুযোগ। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সন্তানদের নিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা নির্মল সময় কাটাতে মেঘনার পাড়ে ছুটে এসেছেন মো. শাহাদাৎ হোসেন। কর্মব্যস্ত জীবনে পরিবারের সঙ্গে এমন অবসর মুহূর্ত খুব একটা মেলে না তাঁর।
শাহাদাৎ হোসেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হাজীরপাড়া ইসলামী ব্যাংকের একটি উপশাখায় কর্মরত। ঈদ উপলক্ষে টানা এক সপ্তাহের ছুটি পেয়ে পাঁচ বছরের ছেলে আব্দুল্লাহ আল সাজিদ ও তিন বছরের মেয়ে আফরিন সেজাকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন নদীর পাড়ে। তাঁর বাড়ি চর হাসান-হোসেন গ্রাম, রামগতি পৌরসভা।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তিনি শীর্ষ সংবাদকে জানান, “এখন নদীর পাড় অনেকটাই ফাঁকা। তবে ঈদের দিন সকাল থেকেই এখানে হাজারো মানুষের ভিড় জমবে। নোয়াখালী, ফেনীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ছুটে আসে মেঘনার তীরে।”
গত কয়েক বছরে আলেকজান্ডার বেড়িবাঁধ এলাকাটি ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে ঈদ ও দীর্ঘ ছুটিতে এখানে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। বিস্তীর্ণ নদী, দিগন্তজোড়া জলরাশি আর ঢেউয়ের ছন্দ—সব মিলিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি এক অনন্য আকর্ষণ।
পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই এখানে আসেন ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। কেউ নদীর পাড়ে বসে আড্ডায় মেতে ওঠেন, কেউবা ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকেন। শিশুদের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
ছোট ব্যবসায়ীদের ঈদ-আশা
বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ফুচকা, খেলনা ও কসমেটিকসের দোকান। তবে প্রশাসন জানিয়েছে, ঈদের পর এসব অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ করা হবে।
খেলনা ও কসমেটিকস বিক্রেতা মো. কাজল শীর্ষ সংবাদকে বলেন,
“রমজানে বেচাকেনা কম। তবুও দিনে একবার দোকান খুলি। আশা করছি ঈদের দিন সকাল থেকে ভালো বিক্রি হবে।”
ফুচকা বিক্রেতা মো. তপু রায়হানও জানান, “ঈদের সময় মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে। তখন ভালো আয় হয়। নিরাপত্তা ভালো থাকায় মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুরতে আসে।”
ট্রলার ভ্রমণে বাড়তি আকর্ষণ
ঈদ ও সরকারি ছুটিতে নদীতে ট্রলার ভ্রমণও বাড়ে কয়েক গুণ। দর্শনার্থীদের অনেকে পরিবার নিয়ে নদীর বুকে ঘুরে বেড়ান।
ট্রলারচালক মো. মোমিন হোসেন বলেন, “দুই ঈদে হাজার হাজার মানুষ আসে। অনেকেই ট্রলারে চড়ে নদী ঘুরে। তখন ভালো আয় হয়। প্রশাসন আমাদের সতর্কভাবে চলাচলের নির্দেশ দেয়। এখন পর্যন্ত বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।”
পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে প্রস্তুতি
বেড়িবাঁধের পাশেই অবস্থিত বিসমিল্লাহ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবার চালু হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। হোটেল মালিক জুয়েল হোসেন দুধা বলেন, “দূর-দূরান্তের পর্যটকদের কাছে আলেকজান্ডার বেড়িবাঁধ একটি জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র। আমরা পর্যটকদের জন্য মানসম্মত খাবার পরিবেশনের চেষ্টা করছি।”
নিরাপত্তায় প্রশাসনের কড়া নজর
ঈদে বিপুল মানুষের সমাগমকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন।
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন দিওয়ান বলেন,
“মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকবে।”
রামগতি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন নিফা জানান, “দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবক দল মোতায়েন থাকবে। নারীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় সকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভ্রমণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।”
লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, “লক্ষ্মীপুরে নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্র না থাকলেও ঈদে মানুষ বেশি ভিড় করে রামগতির মেঘনা বেড়িবাঁধ ও রায়পুরের আলতাফ মাস্টার ঘাট এলাকায়। এসব স্থানে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।”
ঈদের আনন্দ, পরিবারের সান্নিধ্য আর প্রকৃতির টানে মেঘনার পাড় তাই হয়ে উঠছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অন্যতম মিলনমেলা। এবারও ঈদে সেই চেনা চিত্র ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবার।


