মা ইলিশ রক্ষায় মেঘনা নদীতে ২২ দিনের জন্য সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। বুধবার (৭ অক্টোবর) দিনগত মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। তবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে অভিযানে নামার আগেই চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এলাকার কয়েকজন জেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকিমূলক বার্তা দেওয়ায় এই ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।
উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে বরিশালের ওই অঞ্চলের কয়েকজন জেলে তাঁদের ফেসবুক আইডিতে ‘আগামী ২২ দিন আবার দেখা হবে’ এমন নানা বার্তা লিখে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ হুমকি দিয়েছেন। বিষয়টি মৎস্য কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শুধু জলদস্যু ও ডাকাত চক্রের আক্রমণের ভয়ই নয়, কার্যালয়টিতে তীব্র জনবলসংকটও অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে মেঘনায় দস্যুতা প্রতিরোধ ও মৎস্য কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের বিশেষ অভিযান এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও মজুচৌধুরীর হাট সংলগ্ন মেঘনা নদী এলাকায় ইলিশ রক্ষা অভিযানের সময় অতীতেও জলদস্যু ও ডাকাত দলের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক টহলের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুরের রামগতির আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১০০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় নদী থেকে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ সচেতনতা তৈরিতে ইতোমধ্যে নদী ও উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং এবং পোস্টারিং শেষ করেছে।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নিবন্ধিত জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলায় মোট ৫৪ হাজার নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যাদের মূল জীবিকা মেঘনা। এদের মধ্যে ৪২ হাজার ১৫০টি পরিবারকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (ভিজিএফ)-এর আওতায় ১ হাজার ৫৩ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হবে। প্রতি পরিবার পাবে ২৫ কেজি করে চাল। তবে বাকী ১১ হাজার ৮৫০ জন জেলে আপাতত এই সহায়তার বাইরে থাকায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে তাদেরও সহায়তার আওতায় আনা হবে।
সরকারি সহায়তার পরিমাণের ঘাটতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জেলেরা। রায়পুরের এক জেলে বলেন, “যে পরিমাণ জেলে আছে, খাদ্য সাহায্য তার তুলনায় কম। নিষেধাজ্ঞার সময় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। জেলেদের সঠিক তালিকা করে দ্রুত সবাইকে চাল দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।”
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন জানান, “আইন অমান্য করে কেউ নদীতে নামলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মৎস্য বিভাগ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং কোস্টগার্ডের যৌথ দল প্রতিদিন নদীতে অভিযান চালাবে। অভিযান সফল হলে দেশে ইলিশের উৎপাদন লক্ষ্যণীয় মাত্রায় বাড়বে।”
অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে রায়পুর কোস্টগার্ডের প্রতিনিধি জানান, আধুনিক জাহাজ ও দ্রুতগতির স্পিডবোট নিয়ে নদীতে নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে রাডার, উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি ও জিপিএসের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় সন্দেহভাজন জলযানের গতিবিধির ওপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখা হচ্ছে। নদীপথকে জলদস্যুমুক্ত রাখতে কোস্টগার্ডের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।


