ময়মনসিংহে নীরবে বিস্তার ঘটছে এইচআইভি সংক্রমণের। গত ছয় বছরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং সার্ভিস (এইচটিসি) সেন্টারে পরীক্ষা করা ১৩ হাজার ৬৮৭ জনের মধ্যে ১২২ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থী, কর্মজীবী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন স্থানে শনাক্ত হওয়া আরও ১২৬ জন বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই শতাধিক এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি এখন এই হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন।
ছয় বছরে উদ্বেগজনক উত্থান
এইচটিসি সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে যেখানে এক হাজার জনের পরীক্ষায় মাত্র একজনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে ২ হাজার ২৬৭ জনের পরীক্ষায় ৪৩ জন এবং ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মাত্র ৭৮৬ জনের পরীক্ষায় ২০ জনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছরই আক্রান্তের হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ২৫ বছর বয়সি এক আক্রান্ত তরুণ বলেন, প্রথমে জ্বর এবং ওজন কমতে শুরু করায় পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারি আমি এইচআইভি পজিটিভ। রিপোর্ট দেখে মনে হয়েছিল জীবন শেষ। এখন ওষুধ খাই, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলি। তবে সবাই জানলে কী ভাববে, সেই ভয়টাই বেশি কাজ করে।
আক্রান্তদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও নারী
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হিজড়া ও ১৩ জন নারী রয়েছেন। আক্রান্ত নারীদের মধ্যে অন্তত দুজন শিক্ষার্থী, যারা জন্মগতভাবেই মা-বাবার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন। এ ছাড়া বর্তমানে সমকামী জনগোষ্ঠীর তুলনায় সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি এইচআইভি শনাক্ত হচ্ছে।
পাঁচজনের মৃত্যু, অধিকাংশ চিকিৎসার আওতায়
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং একই সুই-সিরিঞ্জ ব্যবহার সংক্রমণের প্রধান ঝুঁকি। এখন পর্যন্ত এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার পর পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, নিয়মিত এআরভি (ARV) সেবন করলে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
চিকিৎসা চলছে, কিন্তু ওষুধ সংকটে বাড়ছে ভোগান্তি
আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালে এখনও বিনামূল্যে এআরভি ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীদের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য আগে যে সহায়ক ওষুধ সরবরাহ করা হতো, তা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বন্ধ রয়েছে। ফলে দরিদ্র রোগীদের অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ এখন নিজ খরচে কিনতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগী বলেন, হাসপাতাল থেকে একটি মাত্র ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও অন্যান্য ওষুধের জন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন সরবরাহ নেই। বাধ্য হয়ে ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়, যা অনেকের সামর্থ্যের বাইরে।
সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার সহায়ক ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করে এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মো. আবদুল আল মামুন বলেন, এআরভি ওষুধ রোগীরা বিনামূল্যে পেলেও অন্যান্য ওষুধ না থাকায় তাদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। শুধু তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় নয়, বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংক্রমণ ও সচেতনতার অভাবও এই বিস্তারের বড় কারণ।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতেও বাড়ছে ঝুঁকি
ট্রান্সজেন্ডার, হিজড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ময়মনসিংহ শাখায় এখন পর্যন্ত ৪৬ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। সংস্থাটির ড্রপ-ইন সেন্টার ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল আশিক বলেন, এই সেন্টারে এইচআইভি পরীক্ষা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৪৬ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। যত দ্রুত শনাক্ত হবে, চিকিৎসা তত কার্যকর হবে। তবে রোগের চেয়ে অনেকেই সামাজিক ভয়টাই বেশি পায়।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
ময়মনসিংহ নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব মো. শামসুদ্দোহা মাসুম বলেন, পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, নীরবে ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণকে আর অবহেলার সুযোগ নেই। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে সচেতনতায় এগিয়ে আসতে হবে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মুহম্মদ মাঈন উদ্দিন খান বলেন, হাসপাতালে আসা প্রত্যেক রোগীকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মানুষ যেন ভয় বা লজ্জায় পরীক্ষা থেকে দূরে না থাকে। ওষুধ সংকটের বিষয়টি খতিয়ে দেখে পুনরায় সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।


