‘আর কিছুদিন অপেক্ষা করুন, ইতালির ভিসা হয়ে যাবে’—এই একটি আশ্বাসে বারবার ভরসা করেছিলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার দত্তকেন্দুয়া ইউনিয়নের পূর্ব শ্রীনাথদী গ্রামের বাসিন্দা মামুন খন্দকার। একমাত্র ছেলেকে ইউরোপের দেশ ইতালিতে পাঠিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্নে তিনি জীবনের সঞ্চয়, ধারদেনা ও ব্যাংক ঋণ মিলিয়ে তুলে দেন মোট ৪৫ লাখ টাকা। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হাতে আসা ভিসা ও কাগজপত্র ইতালীয় দূতাবাসে যাচাই করতে গিয়ে জানতে পারেন—সবগুলোই ভুয়া ও জাল।
রাতে তরুনীর বাড়ী গিয়ে আটক ইসলামি ছাত্র আন্দোলন নেতা
স্বপ্নভঙ্গের এই ঘটনার পর বিদেশে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগ এনে একই পরিবারের ১২ জনসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মাদারীপুরের বিজ্ঞ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী মামুন খন্দকার। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
মামলার অভিযোগ ও ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। নিজেদের অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য দাবি করে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন তারা। সেই বিশ্বাস থেকেই মামুন খন্দকার তার ছেলে মইন খন্দকারকে ইতালি পাঠানোর জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন পূর্ব শ্রীনাথদী গ্রামের কাবিল ফকির, মজিবর ফকির, হাবিবুর রহমান ফকির, রহমান ফকিরসহ একই পরিবারের ১২ সদস্য এবং আরও কয়েকজন। অভিযোগে বলা হয়েছে, অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে কাবিল ফকিরের স্ত্রী তানিয়া আক্তারীর ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে।
এছাড়া অভিযুক্তদের কয়েকজন বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকেও মানব পাচার ও দালালি চক্রের সাথে সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তাদের মধ্যে রহমান ফকিরের স্ত্রী সোহাগী আক্তার শিক্ষকতার আড়ালে দালালি করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে রাজৈর উপজেলায় বেসরকারি সংস্থা ‘প্রশিকা’র ম্যানেজার হাবিবুর রহমান ফকির ও তার স্ত্রী সরকারি কর্মচারী তাহমিনা আক্তার দুলালীও মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় অভিযুক্ত অন্য আসামিরা হলেন—আজাজ বেপারী, আলেম মৃধা, আলী মোকসেদ ও বিউটি বেগম।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৫ আগস্ট ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে নগদ ২৫ লাখ টাকা নেন অভিযুক্তরা। পরে ২০ নভেম্বর ২০২২ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২৮ ডিসেম্বর আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। ২০২৩ সালের ২৯ মে ইতালির একটি কথিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেখিয়ে দ্রুত ভিসা পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে ওই বছরের ২৮ আগস্ট ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসে গিয়ে মামুন খন্দকার জানতে পারেন, তাকে দেওয়া ভিসা ও কাগজপত্রের কোনো ভিত্তি নেই। জাল কাগজপত্রের বিষয়টি ধরা পড়ার পরও নতুন নতুন আশ্বাস দিয়ে অভিযুক্তরা ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ২ লাখ, ২২ অক্টোবর ৪ লাখ, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ২ লাখ এবং ১৯ আগস্ট আরও ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। সব মিলিয়ে নগদ ও ব্যাংকের মাধ্যমে মোট ৪৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই চক্রটির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় নারী ইয়াসমিন অভিযোগ করেন, তার স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকেও ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র।
স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, বিদেশে পাঠানোর নামে মানুষের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ বহুদিনের। প্রতিবাদ করলে হুমকির মুখে পড়তে হয়। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
সালিশকারী বোরহান সিকদার নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, এ বিষয় নিয়ে একাধিকবার সালিশ হলেও কোনো সমাধান হয়নি। তারা বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মাকসুদা খন্দকার বলেন, আমার ভাইয়ের ছেলে মঈন ভালো ছাত্র ছিল। বিদেশে নেওয়ার লোভ দেখিয়ে তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিদেশেও যেতে পারল না, উল্টো লাখ লাখ টাকা হারিয়ে আমরা নিঃস্ব।
তিনি বলেন, ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে জীবনের সব সঞ্চয় ও ঋণ করে ৪৫ লাখ টাকা দিয়েছি। ছেলেটার পড়াশোনা নষ্ট হলো, আমরাও ধ্বংস হয়ে গেলাম। আমি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আসামি হাবিবুর রহমান ফকির ও রহমান ফকির বলেন, আমরা কাউকে বিদেশে পাঠাইনি এবং এ বিষয়ে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কেন আমাদের নামে মামলা হলো তা জানি না।
অন্যদিকে আসামি তানিয়া আক্তারী বলেন, আমার স্বামী ২০২৩ সালের আগে ইতালিতে কিছু লোক পাঠিয়েছেন। পরে স্পন্সর ভিসা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আমরা কাউকে বিদেশে পাঠাই না।
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, মানবপাচারের বিরুদ্ধে প্রশাসন সবসময় জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আদালতের নির্দেশনা বা তদন্তের দায়িত্ব পেলে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় গুরুত্বসহকারে যাচাই করা হবে। তথ্যাদি প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদারীপুর আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান সোহেল বলেন, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। যেকোনো বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির বাইরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের আগে সরকারি অনুমোদন ও ভিসা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।


