লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) দুটি ভবনের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অনিয়ম ও তদারকহীনতার এই চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে আসার পর জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। পুরো ঘটনায় মূল কাঠগড়ায় উঠে এসেছেন দপ্তরের জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী।
অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ও একক সিদ্ধান্তে জুন ক্লোজিংয়ের দোহাই দিয়ে নির্ধারিত কাজের অনেক আগেই শতভাগ বিল ছাড় করে দিয়েছেন। সরজমিনে দেখা যায়, খাতায়-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে এখনও ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার কাজ বাকি রয়েছে। ভুয়া পরিমাপ বই (এমবি) এবং গুণগত মান যাচাইয়ের ভুয়া সনদ সমন্বয় করে কীভাবে এই বিশাল অঙ্কের বিল পরিশোধ করা হলো এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো, তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে বিপুল অঙ্কের অগ্রিম বিল তুলে নিলেও প্রকল্প এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম শ্রমিক অসন্তোষ। অনিয়ম ঢাকতে তড়িঘড়ি কাজের গতি বাড়ানো হলেও শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বকেয়া পাওনা না পেয়ে সম্প্রতি ভুক্তভোগী শ্রমিকরা লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সাইটে কারিগরি তদারকির কোনো প্রকৌশলী না থাকায় মরিচা ধরা রড ও বালু-সিমেন্টের নিম্নমানের অনুপাত দিয়ে চলছে জোড়াতালির ফিনিশিং।
শুধু পিটিআই প্রকল্পই নয়, নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরীর চরম অবহেলা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতায় লক্ষ্মীপুর এলজিইডির পুরো দাপ্তরিক কাঠামো একপ্রকার হযবরল অবস্থায় রূপ নিয়েছে। অফিসের প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষা করতে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ। মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের সঙ্গে সমন্বয় না থাকা এবং সার্বিক বেহাল দশার কারণে গত চার মাসের ব্যবধানে সদর উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের ২ জন উপজেলা প্রকৌশলী এবং ২ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী একযোগে বদলি হয়ে চলে গেছেন। একের পর এক প্রকৌশলীর বিদায়ে দাপ্তরিক কার্যক্রমে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি স্থানীয় ঠিকাদারদের সাথেও তৈরি হয়েছে মারাত্মক সমন্বয়হীনতা। জেলাজুড়ে চলমান সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর তদারকি বা গতি ফেরাতে তিনি কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছেন না। ফলে লক্ষ্মীপুরে এলজিইডির কোটি কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
কাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে শতভাগ বিল পরিশোধ হলো এবং প্রশাসনিক এই বিশৃঙ্খলার কারণ কী-এ বিষয়ে জানতে চাইলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী। শতভাগ বিল পরিশোধের সত্যতা মেনে নিলেও তিনি বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর জেলা সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার কাজ বাকি থাকা সত্ত্বেও শতভাগ বিল তুলে নেওয়া এবং দাপ্তরিক বিশৃঙ্খলা বজায় রাখা চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ। পরিমাপ বই, ফাইনাল বিল ও ছাড়ের অনুমোদন নথি নিরপেক্ষ উচ্চতর তদন্তের আওতায় আনলে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায় ও সার্বিক অনিয়মের আসল চিত্র বেরিয়ে আসবে।


