সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে, গণপূর্ত বিভাগের একের পর এক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি হয়েছে। কিন্তু বদলায়নি লক্ষ্মীপুর গণপূর্ত বিভাগের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. জসিম উদ্দিনের কর্মস্থল। একই কার্যালয়ে, একই চেয়ারে বসে কেটে গেছে ২৭ বছর। ১৯৯৮ সালের ২৬ এপ্রিল গণপূর্ত বিভাগে যোগদানের পর থেকেই লক্ষ্মীপুর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দীর্ঘ এই সময়ে একই দপ্তরে থেকে জসিম উদ্দিনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রভাববলয়-এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা।
রামগঞ্জ উপজেলার দরবেশপুর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই লক্ষ্মীপুর গণপূর্ত কার্যালয়ে রয়েছেন। এরপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সরকার এসেছে-গেছে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বদলি-পদায়ন হয়েছে, গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল পরিবর্তন হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু ২৭ বছরেও নড়েননি জসিম। দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার সুযোগে দপ্তরের ভেতরের কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় ঠিকাদারদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই কার্যালয়ে থাকার কারণে জসিম উদ্দিন সেখানে এক ধরনের প্রভাব তৈরি করেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি নিজের একটি বলয় তৈরি করে রেখেছেন-এমন কথাও রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। শহরের মাদাম এলাকায় তাঁর একটি বহুতল ভবন রয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে ওই সম্পদের বৈধতা কিংবা তাঁর আয়-ব্যয়ের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে কোনো সরকারি তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়গুলো যাচাই করে দেখার দাবি উঠেছে।
এদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থল পরিবর্তনের নীতি অনুসরণ করা হয়। একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অবস্থান না করার বিধানও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা আনতে নতুন নীতিমালা ও পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়নও করা হয়েছে। অথচ এসব পরিবর্তনের মধ্যেও লক্ষ্মীপুর গণপূর্ত কার্যালয়ে জসিম উদ্দিনের ২৭ বছরের অবস্থান যেন এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজের কার্যালয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন জসিম উদ্দিন। দীর্ঘ ২৭ বছর একই কর্মস্থলে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবার নিয়ে আমি সাদামাটা জীবনযাপন করছি। কখনো কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম করিনি। মা-বাবার দোয়া আর সবার সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণেই এখানে টানা চাকরি করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০৩১ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার কথা। সব ঠিক থাকলে এখান থেকেই অবসরে যেতে চাই।
জসিম উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার পেছনে কোনো অনিয়ম বা প্রভাব খাটানোর বিষয় নেই। তবে স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মচারী একই কার্যালয়ে টানা ২৭ বছর থাকার সুযোগ কীভাবে পেলেন এবং এ দীর্ঘ সময় তাঁর কর্মস্থল পরিবর্তনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি কেন?
স্কুলশিক্ষক ফারুক হোসেন বলেন, সরকারি কোনো দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকলে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির সুযোগ বাড়ে। একপর্যায়ে কেউ কেউ রাজনৈতিক মদদে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। অসাধু ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়। তাই চাকরিবিধি অনুযায়ী দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
লক্ষ্মীপুর সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অধ্যাপক রফিকুল আহসান বলেন, ‘সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক জায়গায় তিন বছরের বেশি কীভাবে থাকেন, সেটিই প্রশ্ন। দেশে আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।’ তাঁর মতে, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ চাইলে বিষয়টি যাচাই করে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা সাধারণত নিজ জেলায় চাকরি করেন। জীবনযাত্রার ব্যয় কঠিন। তাই মানবতার খাতিরে অনেক সময় তাঁদের বদলি করা হয় না।’ তিনি বলেন, ‘বিভাগ চাইলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে আমার করার কিছু নেই।


