লক্ষ্মীপুরে ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত আসামী সুমন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেছেন। তবে আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর না করে সাজা পরোয়ানামূলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
রোববার (৩০ আগস্ট ২০২৬) লক্ষ্মীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন দণ্ডপ্রাপ্ত সুমন। এর আগে গত ৩০ জুন মামলার রায় ঘোষণার সময় তিনি পলাতক ছিলেন। ওই দিন লক্ষ্মীপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত মো. সুমন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর মনসা এলাকার মোঃ আহম্মদ উল্যার ছেলে। তিনি মামলার বিচারকাজের শুরু থেকে রায় পর্যন্ত পলাতক থাকায় তার পক্ষে কোনো আইনজীবীও নিযুক্ত ছিলেন না।
আদালতের রায় সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী কমলা আক্তার (বিবি কমলা) সুমনের পাশের বাড়ির বাসিন্দা এবং তার আপন মামাতো বোন। আত্মীয়তার সুবাদে সুমন ওই তরুণীর বাড়িতে যাতায়াত করতেন। একপর্যায়ে তিনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে ভুক্তভোগী ওই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর রাতে ভুক্তভোগীর মা ও বোন বাড়ির বাইরে ধান মাড়াইয়ের কাজে থাকাকালে এবং ছোট ভাই-বোনের অনুপস্থিতির সুযোগে সুমন ঘরে প্রবেশ করে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এ সময় এক সাক্ষী সুমনকে ওই ঘর থেকে বের হতে দেখেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী বিষয়টি তার বাবাকে জানান। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে সুমনের বাবা-মাকে বিষয়টি জানানো হলে তারা ক্ষুব্ধ হন। একপর্যায়ে সুমন ভুক্তভোগীকে বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতে থাকেন।
মামলার বিবরণে জানা যায, ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিয়ের আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীর সঙ্গে আবারও যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন সুমন। পরবর্তীতে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের বিষয়টি জানানো হলে তারা সালিশের মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।
এদিকে ২০২০ সালের ২৬ মে ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষা করা হলে প্রতিবেদনে তিনি ২৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা বলে উল্লেখ করা হয়। করোনা মহামারির কারণে আইনগত প্রতিকার পেতে জটিলতা দেখা দিলে তিনি লক্ষ্মীপুর থানায় অভিযোগ করেন। পরে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা চান।
এরপর অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), নোয়াখালীকে। অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীর গর্ভজাত পুত্র সন্তানের সঙ্গে সুমনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সুমনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ (১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই।
পরে ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালত সুমনের বিরুদ্ধে ওই ধারায় অভিযোগ আমলে নেন। বিচার পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তবে তিনি পলাতক থাকায় অভিযোগ পড়ে শোনানো এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। মামলায় অভিযোগকারিণীপক্ষ মোট নয়জন সাক্ষী উপস্থাপন করে।
সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন। গত ৩০ জুন দেওয়া রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯ (১) ধারায় মো. সুমনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
এদিকে রায়ের দুই মাস পর রোববার সুমন আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে উচ্চ আদালতে আপিল করার শর্তে জামিনের আবেদন করেন। আবেদনে তার আইনজীবী উল্লেখ করেন, সুমন ও ভুক্তভোগী ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দাম্পত্য জীবনযাপন করেছেন। তাদের বিবাহের কাবিননামা ২০২১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নিবন্ধিত হয় বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জামিন আবেদনে আরও দাবি করা হয়, সুমন একজন রেমিট্যান্সযোদ্ধা এবং তাদের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। উচ্চ আদালতে আপিল দায়েরের সুযোগ দিয়ে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার আবেদন করা হয়।
তবে আদালত জামিন না দিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত সুমনকে সাজা পরোয়ানামূলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।


