লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য তৈরি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিপুলসংখ্যক ঘর খালি পড়ে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত অসহায়দের বাদ দিয়ে স্বচ্ছল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বজনদের ঘর বরাদ্দ দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্তত ২১২টি ঘরে তালা ঝুলছে এবং গোপনে বেশ কিছু ঘর বিক্রি করা হয়েছে। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তদারকির অভাবে প্রকল্প এলাকাগুলো এখন মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে উত্তর হামছাদি, দক্ষিণ হামছাদি, দালালবাজার, চররুহিতা, ভবানীগঞ্জ, শাকচর ও নন্দনপুর ঘুরে বেশ কয়েকটি আশ্রয়ণ ও আবাসন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক ঘরে মানুষ নেই। দীর্ঘদিন ফাঁকা থাকায় ঘরগুলো নষ্ট হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর সদর ও চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার ২১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার কয়েকটি এলাকা মিলিয়ে ৩৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ‘যার জমি আছে, ঘর নেই’ প্রকল্পের আওতায় ৭৭১টি ভূমিহীন পরিবারকে সেমিপাকা ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘর নির্মাণে সরকারি ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অসচ্ছলদের কাছ থেকে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে ঘর বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে তখনকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া রেজিস্ট্রি খরচ বাবদ আলাদা টাকা নেওয়া এবং উপকারভোগীদের দিয়ে বিনামূল্যে মাটি কাটার কাজ করানোর অভিযোগও উঠেছে।
দক্ষিণ হামছাদি ইউনিয়নের পশ্চিম নন্দনপুর (মাইলের মাথা) আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দা গ্রামপুলিশ ফয়েজ হোসেন বলেন, “এখানে ১২টি পরিবারের মধ্যে ৬টি পরিবারই থাকে না। জান্নাত বেগম, রেখা রানী, বিপ্লব ও আদরী বেগম তাঁদের ঘর অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে চলে গেছেন। মো. মোহন নামের এক ব্যক্তি তাঁর ঘরটি স্থানীয় জিহাদ হোসেনের কাছে চার লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।” তিনি আরও জানান, বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, টয়লেট ও নলকূপ বিকল হওয়া, জলাবদ্ধতা এবং ঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে সেখানে বসবাসকারীদের।
একই চিত্র দালালবাজারের খিদিরপুর, গঙ্গাপুর ও কাজীর দিঘিপাড় আশ্রয়ণকেন্দ্রে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বসে মাদকের আসর। কোনো প্রতিবাদ করলে উল্টো লাঞ্ছিত হতে হয়।
অভিযোগের বিষয়ে উত্তর হামছাদি ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, দক্ষিণ হামছাদী ইউপি চেয়ারম্যান সাবেক মীর শাহআলম ও দালালবাজার ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম জানান, সরকারি অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে কাজের মান নিয়ে জটিলতা ছিল। মাটি ভরাটের জন্য মেম্বারদের মাধ্যমে কিছু টাকা নেওয়া হয়েছিল এবং উপকারভোগীরা নিজ ঘর হওয়ায় শ্রম দিয়েছেন।
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সংঞ্জয় ঘোষ জানান, ফাঁকা থাকা ২১২টি ঘরে কেউ না থাকায় সেগুলোর বরাদ্দ বাতিল করে নতুন করে বিতরণের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান বলেন, “আশ্রয়ণ কেন্দ্রগুলোতে কতটি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (এডিএম) সঙ্গে কথা বলব। খুব দ্রুতই প্রকল্প এলাকাগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


