পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি, ভারতের চেন্নাই কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন—বিদেশি মাটির চেনা-অচেনা কন্ডিশনে ৫ উইকেটের স্বাদ বহুবার পেয়েছেন। পেস আক্রমণের ধার দেখিয়ে বাংলাদেশের জার্সিতে পেসারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ উইকেট শিকারের রেকর্ডটাও আগেই নিজের করে নিয়েছিলেন। কিন্তু একটা আক্ষেপ পুড়িয়ে বেড়াচ্ছিল এই পেসারকে। ঘরের মাঠে টেস্টে ইনিংসে ৫ উইকেটের দেখা পাচ্ছিলেন না কিছুতেই।
অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হলো। সিলেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে নিজের মাটিতে ক্যারিয়ারের প্রথম ফাইফারের স্বাদ পেলেন তিনি। আর এই অভাবনীয় অর্জনের মধ্য দিয়ে নাম লিখিয়েছেন বিশ্ব ক্রিকেটের অভিজাত এক ক্লাবে। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম ৫টি ফাইফার ভিন্ন ভিন্ন ৫টি দেশে অর্জনের বিরল রেকর্ড এতদিন কেবল ছিল অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি স্পিনার নাথান লায়নের। এবার সেই বিশ্বরেকর্ডের পাতায় লায়নের ঠিক পাশেই জায়গা করে নিলেন বাংলাদেশের এই গতি তারকা।
আর এই অর্জনের দ্যুতিতে সবচেয়ে বেশি আলো ছড়াচ্ছে নোয়াখালী অঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ লক্ষ্মীপুর। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানো এই পেসারের শিকড় তো ওই লক্ষ্মীপুরের মাটিতেই গাঁথা। শৈশবে লক্ষ্মীপুরের ধুলোবালি মেখে,স্থানীয় মাঠে ক্রিকেট খেলে যে হাত দুটো একদিন পেস বোলিংয়ের মন্ত্র শিখেছিল, আজ সেই হাত দুটোই বিশ্বমঞ্চে কাঁপিয়ে দিচ্ছে বিশ্বসেরা ব্যাটারদের। লক্ষ্মীপুরের নাম এখন কেবল দেশের মানচিত্রে নয়, উচ্চারিত হচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেটের রেকর্ডবুকে। ঘরের মাঠে ঐতিহাসিক এই ৫ উইকেট পাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনেও ঝরে পড়ে সেই তৃপ্তি, ‘দেশের মাটিতে ৫ উইকেট পাওয়াটা সব সময় আমার জন্য খুব স্পেশাল।’
সিলেটের এই দিনটি বাংলাদেশের পেস বোলিং ইতিহাসেরও এক সাক্ষী হয়ে রইল। টেস্ট ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি পেসারের বলে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে পড়লেন কোনো ব্যাটার। হাসান মাহমুদের করা বলটিতে ক্যারিবীয় ব্যাটার জশুয়া বিশপকে দারুণ দক্ষতায় স্টাম্পড করলেন লিটন দাস। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ট্যাকটিকস আর হাসানের নিখুঁত নিশানায় গড়া সেই ফাঁদেই কাটা পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ পর্যন্ত হাসানের ক্যারিশম্যাটিক বোলিংয়ে ৩৫৬ রানে গুটিয়ে যায় ক্যারিবীয়দের ইনিংস।
বোলারদের এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ব্যাট হাতে বাংলাদেশ দল শুরুর দিকে একটু হোঁচট খেলেও, দিনের শেষ বিকেলে মুশফিকুর রহিম আর তাওহিদ হৃদয়ের অবিচ্ছিন্ন জুটি ফের জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের দামাল ছেলে হাসান মাহমুদের বিশ্বাস, উইকেটের যে চরিত্র তাতে মুশফিক-হৃদয় জুটি লম্বা করতে পারলে শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান টপকানোই নয়, লিড নেওয়াও সম্ভব।
সুদূর লক্ষ্মীপুরের একার উঠান থেকে শুরু হওয়া ছেলেটির লড়াই আজ তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। ভিন্ন ভিন্ন দেশের কন্ডিশন পেরিয়ে নিজের দেশের মাটিতে রাঙানো এই সোনালী বিকেল কেবল হাসানের নয়, এটি লক্ষ্মীপুরবাসীর জন্যও এক পরম গৌরবের ইতিহাস।


