মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর সামনে রেখে জমজমাট হয়ে উঠেছে লক্ষ্মীপুর জেলার মার্কেট ও শপিংমলগুলো। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উপচে পড়া ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। জেলা শহরের পৌর আধুনিক বিপণি বিতান, চকবাজার মসজিদ মার্কেট, অঙ্গনসভা, আউটলুক, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ও পৌর সুপার মার্কেটসহ জেলার পাঁচটি উপজেলার বিপণি বিতানগুলো এখন ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। ফুটপাতের পোশাক ও জুতার দোকানগুলোতেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
পছন্দের পোশাক কিনতে এক মার্কেট থেকে আরেক মার্কেটে ছুটছেন ক্রেতারা। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ—গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পোশাক, জুতা ও প্রসাধন সামগ্রীর দাম অনেক বেশি। ঈদ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার মনিটরিং জোরদারের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বাহারি ডিজাইনের নতুন পোশাকে সাজানো হয়েছে বিপণি বিতানগুলো। বর্ণিল আলোকসজ্জায় সেজেছে মার্কেটগুলো। সাধ্যের মধ্যে প্রিয়জনদের খুশি রাখতে কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রেতারা। নিরাপদ কেনাবেচা নিশ্চিত করতে মার্কেটগুলোতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
জেলার বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, শিশু ও নারীদের বিপণি বিতানগুলোতে নারী ক্রেতাদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। দেশি-বিদেশি শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, জুতা ও নানা ফ্যাশন সামগ্রীর সমাহার রয়েছে দোকানগুলোতে। এবারের ঈদে পাকিস্তানি থ্রি-পিস, সারারা ও পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি।
ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় কর্মজীবী মানুষ গ্রামে যাওয়ায় বাড়তি খরচ হয়েছে অনেকের। ফলে রমজানের প্রথম ভাগে কেনাকাটা জমেনি। তবে মাসের শেষভাগে বেতন পাওয়ার পর ১৫ রমজান থেকে মার্কেটগুলোতে জমজমাট কেনাবেচা শুরু হয়েছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী সুফিয়া খাতুন দুই মেয়ে ও ভাগনিকে নিয়ে অঙ্গনসভা শপিংমলে কেনাকাটা করতে এসেছেন। ভাগনির জন্য পোশাক কিনতে পারলেও নিজের দুই মেয়ের পছন্দের পোশাক বাজেটের বাইরে হওয়ায় কিনতে পারেননি। তিনি বলেন, “আয় সীমিত। তাই সাধ থাকলেও সব ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।”
প্রবাসী পারভেজ আলম পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করতে এসে শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য শাড়ি ও পাঞ্জাবি-পাজামা এবং মেয়ের জন্য থ্রি-পিস ও জুতা কিনেছেন। তবে দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় স্ত্রীর জন্য শাড়ি কেনা হয়নি।
চকবাজার মসজিদ মার্কেটের এক দোকানে স্কুলশিক্ষিকা রুবিনা ইয়াসমিন বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার দাম অনেক বেশি। একটি থ্রি-পিসের গায়ে ৫ হাজার টাকা লেখা থাকলেও দোকানি ৮ হাজার টাকা চাইছেন। পরে দরদাম করে কিনেছি। ঈদকে পুঁজি করে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে।”
রায়পুর গাজী মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা এক দম্পতি জানান, গত বছর যে পোশাক ১২০০ টাকায় কিনেছেন, এবার একই পোশাকের দাম চাওয়া হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২৫০০ টাকা। দাম বেশি হলেও ঈদের কেনাকাটা তো করতেই হবে।
রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বাজারগুলোতেও ঈদ কেনাকাটায় ব্যস্ততা দেখা গেছে। চরাঞ্চলের মানুষ সাধ্যের মধ্যে নতুন পোশাক কিনছেন। নিম্নআয়ের মানুষদের ফুটপাতের দোকানে বেশি ভিড় করতে দেখা গেছে।
পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে কসমেটিকস ও জুয়েলারির দোকানেও ভিড় বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের শেষ সপ্তাহেই বিক্রি সবচেয়ে বেশি হয়। এবারের কালেকশনে গাউন, ফারসি, হেনা, লেহেঙ্গাসহ দেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি ও চায়নিজ বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক রয়েছে। কাপড়ের মান ভালো হওয়ায় দামও কিছুটা বেশি।
অঙ্গনসভা শপিংমলের স্বত্বাধিকারী ফিরোজ আহমেদ বলেন, আমদানি খরচ বেড়েছে। ভারত, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে আনা পণ্যে পরিবহন ও শুল্ক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতি পণ্যে অতিরিক্ত ১০০–১৫০ টাকা দাম পড়ছে। তবুও উন্নত কালেকশনের কারণে বিক্রি ভালো।
কসমেটিকস ব্যবসায়ীরা জানান, পোশাক কেনা শেষ করে ক্রেতারা প্রসাধনী ও জুয়েলারির দিকে ঝুঁকছেন। শেষ সময়ে ভালো বিক্রির আশাবাদ ব্যক্ত করেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ পুলিশ-এর হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, জানান—ঈদ উপলক্ষে ক্রেতাদের নিরাপদ কেনাকাটা নিশ্চিত করতে মার্কেটগুলোতে সাদা পোশাকধারী পুলিশ, ডিবি নজরদারি, জালনোট শনাক্তকরণ টিম ও বডি-ক্যামেরাসহ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় থাকবে।
ঈদকে কেন্দ্র করে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোর তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুরবাসী।


