লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর বুকে ভাসমান শতাধিক জেলে পরিবারের জীবন যেন এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। নৌকাই তাদের ঘর, নদীই তাদের ঠিকানা। ঝড়-বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়—সব প্রতিকূলতার মাঝেও এই নৌকাতেই টিকে থাকে তাদের জীবন। নদীতে মাছ ধরেই চলে তাদের জীবিকা, নদীতেই তাদের বসবাস।
কিন্তু সরকারি নির্দেশে মেঘনা নদীতে দুই মাসের জন্য সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসব জেলে পরিবার। হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেছে তাদের একমাত্র আয়ের পথ। সামনে পবিত্র ঈদ—তবু নেই আনন্দ, নেই কোনো প্রস্তুতি; বরং প্রতিদিন চলছে বেঁচে থাকার লড়াই।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজু চৌধুরীর হাট এলাকার ভাসমান জেলে আব্দুল হালিম বলেন, “৩০ বছর ধরে এখানে আছি। এই নদীই আমাদের জীবন-মরণ। এখন দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ, সামনে ঈদ—কিন্তু আমাদের কোনো আনন্দ নেই। ছেলেমেয়েদের নতুন জামা কিনে দিতে পারছি না। সরকার থেকে ৪০ কেজি চাল পেয়েছি, সেটি দিয়ে কোনোভাবে ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছি।”
শরিফা বেগমের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ। ছোটবেলা থেকেই এই নদীতেই তার বেড়ে ওঠা। তিনি বলেন, “অভিযান চলছে, মাছ ধরতে পারছি না। ঈদের কেনাকাটা তো দূরের কথা, ছেলেমেয়েদের চাওয়া পূরণ করতে পারছি না। আল্লাহ যদি তৌফিক দেন, তাহলে কিছু করতে পারব—নইলে না।”
আছিয়া খাতুন নামের আরেক ভাসমান নারী বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। জাল ফেলতে পারি না, আয় নেই। ছেলে-মেয়েদের নতুন জামা কিনে দেবো কীভাবে? তাদের ঈদের আনন্দ দিতে পারব না।”
জেলে হোসেন মাঝির কণ্ঠে ঝরে পড়ে গভীর অসহায়ত্ব, “আমাদের বাপ-চাচারাও এখানে থাকতো, আমরাও এখানেই আছি। মরলে দাফন করার মতো জমিও নেই। দোকান থেকে বাকি এনে খাই। ঈদ করব—সে অবস্থাও নেই। টাকা থাকলে ছেলেমেয়েদের জামা কিনে দিতাম, একটু আনন্দ করতাম। কিন্তু এখন আমাদের কিছুই নেই।”
নদীর বুকে ভাসমান এই মানুষগুলোর জীবনে ঈদ যেন এখন শুধু এক অধরা স্বপ্ন। প্রতিদিনের সংগ্রামে যেখানে খাবার জোটানোই কঠিন, সেখানে নতুন কাপড় বা আনন্দ—সবই যেন বিলাসিতা।
এসব অসহায় জেলে পরিবারের একটাই চাওয়া—সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষ যদি তাদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে অন্তত ঈদের দিনটিতে সন্তানদের মুখে একটু হাসি ফুটাতে পারবেন তারা। একটু সহায়তা পেলেই, নদীর বুকেও জ্বলে উঠতে পারে ঈদের আলো।


