জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে কার্যত থমকে গেছে লক্ষ্মীপুর জেলার পরিবহন খাত। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। ফলে তেলের আশায় পাম্পের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ফিরে যেতে হচ্ছে চালকদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কমলনগর, রামগঞ্জ, রায়পুর, রামগতি এবং সদর উপজেলার অধিকাংশ পেট্রোল পাম্প এখন প্রায় জ্বালানি শূন্য। শহরের পরিচিত ফিরোজ পেট্রোল পাম্প, ধরিত্রী পেট্রোল পাম্প এবং উত্তর ও দক্ষিণ তেমুহনী এলাকার পাম্পগুলোতেও দিনের অধিকাংশ সময় তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
কোথাও কোথাও ইফতারের পর সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য। ফলে সড়কের পাশে তেলের অপেক্ষায় পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
লাইনে দাঁড়িয়ে হতাশ চালকরা
তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক চালক হারুনুর রশীদ বলেন, “পাম্পে পাম্পে ঘুরছি কিন্তু কোথাও ডিজেল নেই। কখন তেল আসবে কেউ বলতে পারছে না। আমাদের চাকা ঘুরলেই পেট চলে, কিন্তু তেল না থাকায় এখন রাস্তায় বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই।”
একই সংকটে পড়েছেন মিলন হোসেন নামের আরেক ট্রাকচালক। তিনি বলেন, বাজারে তেল নেই, গন্তব্যে পৌঁছাব কীভাবে? প্রতিদিন মাইলের পর মাইল ঘুরেও তেল মিলছে না।”
মোটরসাইকেল চালকদেরও দুর্ভোগ
শুধু ট্রাকচালকরাই নয়, মোটরসাইকেল চালকরাও পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। হাসান মাহমুদ নামের এক চালক জানান, তিনি পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে উত্তর তেমুহনী এলাকার একটি পাম্পে এসে দীর্ঘ অপেক্ষার পর মাত্র ২০০ টাকার তেল পেয়েছেন।
উত্তর তেমুহনীর মেসার্স মোজাম্মেল হক পেট্রোল পাম্পে ইফতারের পর কিছু সময়ের জন্য তেল সরবরাহ করা হলেও সেখানে বড় যানবাহনের প্রবেশ প্রায় বন্ধ। সীমিত তেলের জন্য মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট
এদিকে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে রোববার (১৫ মার্চ) দুপুরে সদর উপজেলার মজু চৌধুরীর হাট এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
অভিযানকালে জ্বালানি ব্যবসায়ীদের যথাযথ মজুদ সংরক্ষণ ও বিক্রয় রেজিস্টার সংরক্ষণের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিস্ফোরক লাইসেন্স না থাকা এবং বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে পেট্রোলিয়াম আইন, ২০১৬ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৩১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
বাড়তে পারে পণ্যের দাম
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে। এতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ঈদযাত্রায় নজর প্রশাসনের
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে এলাকার বাস কাউন্টারগুলোতেও সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনস্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভোক্তা সুরক্ষা এবং ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে অন্ধকার পেট্রোল পাম্প আর তেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকগুলোর দীর্ঘ সারি যেন স্পষ্ট করে দিচ্ছে—জ্বালানি সংকটে এই মুহূর্তে ধীরগতিতে ঘুরছে লক্ষ্মীপুরের অর্থনীতির চাকা।


