সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরে প্রকাশ হয়ে পড়েছে এক নজিরবিহীন সিন্ডিকেট কারসাজি, স্বজনপ্রীতি ও নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাদ্য বিক্রেতাকে সারের ডিলার বানানো, একই পরিবারের হাতে একাধিক ডিলারশিপ কুক্ষিগত রাখা এবং রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে নিয়োগ দেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের অন্ধকারে রেখে ‘একতরফা’ এই সুপারিশ ঘিরে পুরো জেলায় এখন তোলপাড় চলছে।
ঘটনার গভীরে গিয়ে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ‘ইফাজ এগ্রো’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে সার ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি কোনো প্রথাগত কৃষি সারের ব্যবসা নয়, বরং পশুখাদ্যের খুচরা ও পাইকারি দোকান। ডিলারশিপের জন্য বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার নিজস্ব বা ভাড়া করা কোনো গুদামঘরও নেই প্রতিষ্ঠানটির-যা সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালার সুস্পষ্ট অমান্য।
অনুসন্ধানে থলে থেকে বিড়াল বেরিয়ে এসেছে আরও এক জায়গায়। ইফাজ এগ্রোর স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেনের আপন ভাই ইকবাল হোসেন (ইকবাল ট্রেডার্স) আগেই বিএডিসির নিবন্ধিত সার ডিলার ও খুচরা কার্ডধারী। নীতিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে-একই পরিবারের দুই সদস্যকে ডিলারশিপ দেওয়া যাবে না। কিন্তু সব নিয়মকানুন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পর্দার আড়ালের ‘অদৃশ্য ইশারায়’ জাকিরের নাম সুপারিশ করা হয়েছে।
পৌরসভার বঞ্চিত সার ব্যবসায়ীরা ক্ষোভে ফুঁসছেন। লক্ষ্মীপুরের জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান ও ইয়াছিনুর রহমান এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ ঠুকে দিয়েছেন।
ব্যবসায়ী আবদুর রহমান ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “শহরে অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন অভিজ্ঞ ও যোগ্য সার ব্যবসায়ী রয়েছেন। কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে, সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে পশুখাদ্য বিক্রেতাকে ডিলার বানিয়ে দেওয়া হলো! এটি স্পষ্টত একটি পরিকল্পিত নাটক। অবিলম্বে এই ভুয়া সুপারিশ বাতিল করে পুনঃবিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে।”
এদিকে চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নেও ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব আর সুবিধাবাদিতার নগ্ন রূপ। সেখানে মেসার্স বাহার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী বাহার উদ্দিনের নাম ডিলার হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। বাহার উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অঙ্গসংগঠনের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতাদের সাথে তার বেশ কিছু ঘনিষ্ঠ স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে স্থানীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
তবে সব অভিযোগ হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন বিতর্কিত ইফাজ এগ্রোর স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন। তার দাবি, “পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখে আমি বৈধভাবেই আবেদন করেছি। কেউ আবেদন না করলে সেটা তো আমার অপরাধ নয়! পশুখাদ্য ও সারের ব্যবসা আমি আলাদা ঘরেই করব। আর আমার ভাই বিএডিসির ডিলার, কৃষি বিভাগের নয়। ব্যবসায়িক হিংসা থেকেই প্রতিপক্ষরা এসব রটাচ্ছে।”
অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ জহির আহমেদ এক প্রকার দায় এড়িয়ে মন্তব্য করেন, “ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়াটি উপজেলা পর্যায় থেকে যাচাই হয়ে মন্ত্রণালয়ে যায়, সেখান থেকেই সুপারিশ আসে। ডিলার এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এখানে আমাদের স্থানীয় দপ্তরের হাত বেঁধে দেওয়া, তাই এখন আর অভিযোগ দিয়ে কোনো লাভ হবে না।”
নীতিমালা তোয়াক্কা না করে কীভাবে পশুখাদ্য বিক্রেতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ফাইল মন্ত্রণালয়ে ছাড় পেল-এমন প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জালিয়াতি ও সিন্ডিকেটের হাত থেকে সার খাতকে বাঁচাতে এখন জেলা প্রশাসকের কঠোর হস্তক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন লক্ষ্মীপুরের প্রকৃত ব্যবসায়ীরা।


