লক্ষ্মীপুরে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছে অনিরাপদ ও অরক্ষিত। অনেক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে সন্ধ্যা হলেই অবাধে বহিরাগতদের প্রবেশ, বখাটেদের আড্ডা ও মাদকের আসর বসছে। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে বখাটে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেশি দেখা যায়। বখাটেরা আড্ডা ও মাদক সেবনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ মালামাল চুরি করে নিয়ে গেলেও প্রশাসনের তেমন নজরদারি নেই। এতে অনেকটা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা।
রায়পুর উপজেলার সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাখালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, কাপিলাতলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি, জনকল্যাণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, রচিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, উদমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেএসপি পাবলিক স্কুল, এমএম কাদের একাডেমি, কেরোয়া মানছুরা উচ্চ বিদ্যালয়, নতুনবাজার মহিলা কলেজ, রায়পুর সরকারি কলেজ ও কেরোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের অভিযোগও একই রকম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার পর সন্ধ্যার পরপরই শুরু হয় বখাটেদের আড্ডা ও মাদক সেবন। প্রতিদিনই বখাটে মাদকসেবীরা বিদ্যালয়ের মাঠ, বারান্দা ও ছাদে মাদকের আসর বসাচ্ছে। তারা রাতভর মাদক সেবন ও কেনাবেচা করে। স্থানীয়রা তাদের কাছে এক প্রকার অসহায়। মাদকসেবী ও বখাটেদের এমন তাণ্ডব অত্যন্ত অস্বস্তিকর। তারা মাদক সেবনের পর গভীর রাতে আশপাশের বাড়িতে ঢুকে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়।
মাদকের সহজলভ্যতার কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া তরুণেরাও আশঙ্কাজনকভাবে মাদকের দিকে ঝুঁকছে। জেলায় গাঁজা থেকে শুরু করে বাংলা মদ ও ইয়াবাসহ নানা রকম মাদক সেবন ও কেনাবেচা হচ্ছে। অভিজাত পরিবারের অনেক সন্তান এই মাদকের নেশায় ভয়াবহভাবে আসক্ত। প্রশাসনের সঠিক নজরদারি না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করছেন কয়েকজন অভিভাবক।
গত কয়েক দিনে ৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরেজমিনে ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রায়পুর উপজেলার সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি ও তার ভেতরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে দুটি ভবন রয়েছে। সেখানে ভবনের আশপাশে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ও ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম পড়ে আছে। এছাড়া মাদকসেবীদের বসার জন্য বিদ্যালয়ের পেছনে খড় বিছানো রয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলে, “প্রায় সময় স্কুলের বারান্দায় খালি বোতল ও সিগারেটের টুকরো পড়ে থাকতে দেখা যায়। এতে আমাদের খুব খারাপ লাগে।”
মার্চেন্টস একাডেমি মার্কেটের ব্যবসায়ী জহির ও ফিরোজ আলম বলেন, মাদকের সহজলভ্যতায় এখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও বিক্রি হয়। মাদকাসক্তদের কারণে বিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। স্কুলের নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত পুলিশি টহল প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদকসেবীর বাবা বলেন, তাঁর ছেলে নেশাগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে পরিবারে সব সুখ নষ্ট হয়ে গেছে। শত চেষ্টা করেও তাকে নেশার জগৎ থেকে ফেরানো যায়নি। পুলিশ কেবল খুচরা মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করলে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। যাদের আশ্রয়ে এসব মাদক বিক্রি হয়, তাদের গ্রেপ্তার করলেই মাদক নির্মূল সম্ভব।
হায়দরগঞ্জ বাজারের স্থানীয় বাসিন্দা মাহফুজ আলম বলেন, সন্ধ্যা হলেই রচিম উদ্দিন স্কুল প্রাঙ্গণে বখাটেদের আড্ডা ও মাদকের আসর বসে। প্রশাসন স্বপ্রণোদিত হয়ে কখনও এগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় না। কেবল আমরা ফোনে খবর দিলেই তারা আসে। অনেক সময় খবর পেয়েও আসে না।
সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাসিনা আক্তার বলেন, “বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থী বৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নতির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি। বিদ্যালয়টি এলাকার সম্পদ। তবে দুঃখের বিষয়, রাত হলেই এটি বখাটেদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। প্রতিদিন সকালে বিদ্যালয়ে এসে দেখি বারান্দায় ময়লা-আবর্জনা ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের উচ্ছিষ্ট পড়ে আছে।” তিনি এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
রায়পুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর স্বপন পাটোয়ারীসহ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, মাদক সেবন ও বিক্রি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অনেক বাসিন্দা তাঁর কাছে এসব অভিযোগ নিয়ে আসেন। মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের প্রতিরোধ করা না হলে এই বিষবৃক্ষ একসময় মহীরুহে পরিণত হবে। মাদকের অপব্যবহার রোধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার তৌহিদুল ইসলাম ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মঈনুল ইসলাম জানান, এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। ছুটির পর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নির্জন হয়ে যায়। বিষয়টি এর আগে কেউ জানাননি। এখন থেকে পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধির দাবি জানান তাঁরা।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, “বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে অবগত হলাম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব বিদ্যালয়ে এমন সমস্যা আছে, সেখানে নিয়মিত পুলিশি টহল দেওয়া হবে। মাদকের সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”


