নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা। তাঁর শূন্য চেয়ারে বসে দিব্যি রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন একজন আয়া! অন্যদিকে, নির্ধারিত স্টেশনে না থেকে জেলা শহরে ‘প্র্যাকটিস’ নিয়েই ব্যস্ত কেন্দ্রের একমাত্র চিকিৎসক। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের এই চিত্র যেন পুরো জেলার রুগ্ণ স্বাস্থ্যসেবার এক খণ্ড প্রতিচ্ছবি।
কেরোয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা সুফিয়া বেগমের (অরেঞ্জ) বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, কোনো ধরনের দাপ্তরিক ছুটি না নিয়ে বা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। গত ২০ দিন ধরে তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রসূতি নারীসহ সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ওই কেন্দ্রের একজন আয়া। চিকিৎসাবিদ্যায় কোনো জ্ঞান না থাকলেও আয়ার দেওয়া ব্যবস্থাপত্রেই ভরসা করতে হচ্ছে অসহায় গ্রামবাসীকে। এতে ভুল চিকিৎসায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অভিযোগের তির কেন্দ্রের একমাত্র চিকিৎসক ডা. আবদুল্লাহ আল নোমানের দিকেও। স্থানীয়দের দাবি, গত এক বছরেও তিনি নিয়মিত কেন্দ্র পরিদর্শনে যাননি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে তিনি সপ্তাহে তিন দিন জেলা সদরের হাসপাতালে রোগী দেখেন। গত রোববার সকালে লক্ষ্মীপুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাহবুব হাসান ভূঁইয়া কেন্দ্রটি পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়মের সত্যতা পান। তবে তিনি চলে যাওয়ার পরপরই ডা. নোমানও কর্মস্থল ত্যাগ করে জেলা শহরে পাড়ি জমান বলে অভিযোগ উঠেছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, রায়পুরসহ পাঁচটি উপজেলায় ১৬৫টি পদ বর্তমানে শূন্য। গত ১৫ বছর ধরে অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো নিয়োগ নেই। শুধু জনবল সংকটই নয়, ভৌত কাঠামোর অবস্থাও শোচনীয়। সোনাপুরসহ বেশ কয়েকটি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র চিকিৎসক ও কর্মচারীর অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কেন্দ্রগুলো এখন ঝোপঝাড়ে ঢাকা ভুতুড়ে ভবনে পরিণত হয়েছে। জীর্ণ এসব ভবন থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে দরজা-জানালাও।
চরপাতা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চিকিৎসকের বদলে ওষুধ দিচ্ছেন একজন পরিদর্শিকা। সেবা নিতে আসা পারুল বেগম আক্ষেপ করে বলেন, “আগে এখানে বড় ডাক্তার আসত। অনেক বছর ধরে কাউকে দেখি না। এখন জ্বর-ঠান্ডার বড়ি ছাড়া আর কিছুই মেলে না।”
রায়পুর পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জিয়াউল কাদের বাবলু অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “ডা. আবদুল্লাহ আল নোমানের অনিয়ম নিয়ে একাধিকবার জেলা পর্যায়ে লিখিত জানানো হয়েছে, কিন্তু অদৃশ্য কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসান মাহমুদ বলেন, “পরিদর্শিকার অনুপস্থিতিতে আয়া দিয়ে চিকিৎসা করানোর বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জনবল সংকটের কারণে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এই অচলাবস্থা কাটবে বলে আশা করছি।”
গ্রামের পিছিয়ে পড়া মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দায়িত্বহীনতার কবলে, তখন রায়পুরের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—চিকিৎসকের বদলে আয়ার চিকিৎসায় আর কতদিন চলবে এই ‘মরণখেলা’?


