গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত, নিবন্ধন নং ১১৪
  1. অনিয়ম
  2. অন্যান্য
  3. অর্থ ও বাণিজ্য
  4. আইন-বিচার
  5. আন্তর্জাতিক
  6. আবহাওয়া
  7. কৃষি ও প্রকৃতি
  8. খেলাধুলা
  9. গণমাধ্যম
  10. চাকরি
  11. জাতীয়
  12. ধর্ম
  13. নির্বাচন
  14. প্রবাসের খবর
  15. ফিচার
  16. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  17. বিনোদন
  18. বিশেষ প্রতিবেদন
  19. রাজনীতি
  20. শিক্ষাঙ্গন
  21. শেখ হাসিনার পতন
  22. সম্পাদকীয়
  23. সারাদেশ
  24. স্বাস্থ্য
  25. হট আপ নিউজ
  26. হট এক্সলুসিভ
  27. হাই লাইটস

রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের থাবায় মা ইলিশ! অভিযানে বড় গলদ

Link Copied!

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে সরকারঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীসহ দেশের বিভিন্ন নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবাধে চলছে মা ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা। এ কাজে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একাধিক সিন্ডিকেট জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার ১০ দিন পার হলেও অনেক জেলে সরকারি খাদ্যসহায়তার চাল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। এতে একদিকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে কর্মহীন জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে ইলিশ শিকারে নামায় ১০ দিনে ৯৩টি অভিযান পরিচালনা করে মৎস্য বিভাগ। এসব অভিযানে ৮৩ জন জেলেকে আটক করা হয়। ২ দশমিক ২৭২ মেট্রিক টন ইলিশ, ৯ দশমিক ৫০৮ লাখ মিটার মাছ ধরার জাল এবং ১৪টি নৌকা ও একটি স্পিডবোট জব্দ করা হয়। এছাড়াও ১০টি ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অবৈধভাবে মাছ শিকার ও বহনের দায়ে ৪৯টি মামলায় ৩০ জেলেকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মা ইলিশ রক্ষাসহ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ২২ দিন লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীসহ দেশের ২০টি জেলার নদ-নদী, মোহনা ও সাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ সময়ে নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। এ সময় নিবন্ধিত প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি হারে চাল খাদ্যসহায়তা দেবে সরকার। অথচ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক জেলেকে নদীতে মাছ শিকার করতে দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলায় ৪২ হাজার ১৫০ জন কার্ডধারী সরকারের নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের অভিযানের সময় এসব জেলে পরিবারের জন্য (ভিজিএফ) খাদ্যসহায়তা হিসেবে ১ হাজার ৫৩.৭৫ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে কার্ডধারী এসব জেলে ২৫ কেজি হারে চাল খাদ্যসহায়তা পাবে। তবে বেসরকারি হিসাবে জেলায় প্রায় ৬৫ হাজার জেলে রয়েছে।

গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিনে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর রমণী মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীরহাট সংলগ্ন ভাসমান জেলেপল্লী ও চর রমণী মোহনের দক্ষিণের নদীর পাড়ের চিহ্নিত কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অসাধু জেলেরা একের পর এক মাছ ধরার নৌকা পাড়ে ভিড়াচ্ছে। এ সময় মাছ ব্যবসায়ীরা জেলেদের নৌকা থেকে দরদাম করে ইলিশের খাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। কোস্টগার্ডের ট্রলারের উপস্থিতি দেখলেই পরিস্থিতি পাল্টে ফেলে এসব জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। পরে কোস্টগার্ডের ট্রলার চলে গেলে পুনরায় ইলিশ বেচাকেনা করতে দেখা যায় এসব অসাধু জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের। চর রমণী মোহন ইউনিয়নের জেলেরা জানান, অভিযানের আগেও তারা নদীতে মাছ ধরতে পারেনি। এখন সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে তো তাদের পরিবারের পেট চলবে না। তাছাড়া সরকারের শুধু ২৫ কেজি চাল দিয়ে পুরো ২২ দিন চলবে না। এ সময় তাদের মধ্যে ক্ষিপ্ত হয়ে এক তরুণ জেলে বলেন, “শুধু আমাদের নিষেধাজ্ঞার গান শোনান কেন! মেঘনার সাহেবের চর, চর মেঘায় বড় বড় সাবার (ইলিশ ট্রলার) দিয়ে টনে টনে মাছ ধরে বিক্রি করছে। মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ সেগুলো দেখেও না দেখার মতো করে নদীতে অভিযান চালাচ্ছে। আমরা ঘাটে কয়টা বিক্রি করি, এগুলো ধরতে কোস্টগার্ড বারবার আসে। সরকার আমাদের পরিবারের দায়িত্ব নিলে আমরা মাছ ধরব না।”

এদিকে রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের শেল্টারে চলছে ইলিশ শিকারের মহোৎসব। রামগতি বাজার মাছঘাট সংলগ্ন ভাসমান জেলে (মান্তাপাড়া) এলাকায় সকাল-বিকেল ও রাতে হরহামেশাই বেচাকেনা হচ্ছে ইলিশ। শত শত ব্যবসায়ী মাছ কিনতে চিহ্নিত স্পটগুলোতে গাড়ি নিয়ে ভিড় করছে। স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিকেলে ৮ থেকে ১০টি নৌকা মাছ শিকার করে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঘাটে ফেরে। এ ছাড়া রাতভর মাছ শিকার করা আরও ১২ থেকে ১৫টি নৌকা ভোরে ঘাটে আসে। সেখানে উপস্থিত তিনজন মাছ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান ও হালিম মাঝির নিয়ন্ত্রণে এসব নৌকা পরিচালিত হচ্ছে। তাঁদের দাবি, নদীতে মাছ শিকারে নামা জেলেদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং পুলিশসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

সিরাজ ব্যাপারী ও ইসমাইল মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়েও তাঁরা ওই এলাকা থেকে মাছ কিনছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়ী নিয়মিত সেখানে মাছ কেনাবেচা করেন। অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেনের অভিযোগ, এ বছর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের তৎপরতা আগের বছরের তুলনায় কম।

এদিকে কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাটে চরকালকিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হুমায়ুন কবির ও ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ থেকে সাতটি নৌকায় মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া মতিরহাট এলাকার এক মাছ ব্যবসায়ীর দাবি, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে একটি চক্র প্রায় ৩০টি মাছ ধরার ট্রলার নদীতে নামিয়েছে। এসব ট্রলারের ধরা ইলিশ সদর উপজেলার সাহেবের চরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু সদস্যের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুই উপজেলার ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অভিযুক্ত এসব নেতাকর্মী।

এছাড়াও শুক্রবার সন্ধ্যায় কমলনগরে মতিরহাট মাছঘাটের পূর্বপাশে ২৫টি ভাসমান জেলেপল্লীতে দেখা যায়, ফরহাদ নামে এক জেলে মাছ ধরার দুই বস্তা জাল নৌকায় তুলছেন। পাশে বসে থাকা ওই পল্লীর সরদার বাবুল মাঝিসহ কয়েকজনকে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। জানতে চাইলে ফরহাদ জানান, ৯ সদস্যের পরিবার, জেলে অভিযানে সরকারি কোনো সুবিধাই পাই না। মাছ ধরেই সংসার চালাতে হয়। সরকারের আইন মানতে গেলে কিস্তিওয়ালা বসবাসের নৌকা বিক্রি করে দেবে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হাজিমারা, আলতাফ মাস্টারঘাট, সাজু মোল্লারঘাট ও রাউলঘাটের অদূরে বিভিন্ন স্পটে একইভাবে ইলিশ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারে নামায় সরকারের এ বিশেষ অভিযান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কিছু জেলের এমন কর্মকাণ্ডে নদীতে মাছ ধরার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এজন্য মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের ঢিলেঢালা অভিযানকে দায়ী করছেন তারা। তবে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার না হলে নিষেধাজ্ঞার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

রামগতি উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, “অভিযুক্তদের নাম আমিও শুনে আসছি। গত দুই দিনে ওই এলাকায় কয়েকবার গিয়েছি। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে ফোনে সতর্কও করেছি। কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান চলছে।”

এদিকে, নিষেধাজ্ঞার সময় কর্মহীন হয়ে পড়া জেলেদের জন্য সরকারের খাদ্যসহায়তা হিসেবে চাল বিতরণের ব্যবস্থা থাকলেও অনেক জেলে ১০ দিনেও চাল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়নের মনির মাঝি, শরীফ মাঝি, জাহাঙ্গীর মাঝির অভিযোগ, সরকারের নিষেধাজ্ঞা মেনেই মাছ ধরার নৌকা ডাঙায় তুলে নিয়েছি। কিন্তু সময়মতো সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে খাদ্যসংকটে পড়তে হচ্ছে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার নেই, তার ওপর সহায়তা পেতে বিলম্ব হওয়ায় তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অপরদিকে জেলেদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রকৃত জেলেদের কাছে সরকারি সহায়তা যথাসময়ে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে না নামা জেলেরা আর্থিক সংকটে পড়লেও কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন।

চর কালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান মো. ছায়েফ উল্যাহ বলেন, “আমাদের ইউনিয়নে ৩১শ জেলে রয়েছে। তাদের নিবন্ধন কার্ড সংগ্রহে সময় লাগায় চাল বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। রবিবার থেকে প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি হারে চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হবে।”

সচেতন মহলের মতে, নিষেধাজ্ঞা সফল করতে হলে নদীতে নিয়মিত টহল, অবৈধ মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি চাল দ্রুত বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তালিকা প্রণয়ন ও সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, “ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে শুরু থেকে মৎস্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ সদস্যরা তৎপর রয়েছে। ইতোমধ্যে ৯৩টি অভিযানে ৮৩ জেলে আটক ও ৩০ জনকে জেল ও ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে আমাদের উদ্দেশ্য সাজা বা অর্থ আদায় নয়, সরকারি নির্দেশনা সম্পর্কে জেলেদের সচেতন করা। কিছু অসাধু জেলে বিভিন্ন স্থানে তারপরও মাছ শিকারে নদীতে নামার খবর বিভিন্ন মাধ্যমে নজরে এসেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।”

Editor

Editor

সম্পাদক

সর্বমোট নিউজ: 415

Share this...
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বে-আইনি।
আরও দেখুন
সর্বশেষ
  • আমাদেরকে ফলো করুন…