ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায় থাকা লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলার দুই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সচিবকে বদলি করা হয়েছে। রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আফসার উদ্দিনকে রামগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদে এবং রামগঞ্জের কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মাসুদ আলমকে রায়পুর উপজেলার ৯ নম্বর দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়ন পরিষদে বদলি করা হয়েছে।
দুই সচিবের বিরুদ্ধেই নাগরিক সেবা ও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে অতিরিক্ত অর্থ বা কমিশন নেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আফসার উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। আর মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার সকালে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা। এর পরপরই তাঁকে রায়পুরে বদলির আদেশ দেওয়া হয়।
একই ধরনের অভিযোগে দুই সচিবকে পরস্পরের উপজেলায় বদলি করার বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে বদলির আদেশে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো উল্লেখ নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়নি যে অভিযোগের কারণেই তাঁদের বদলি করা হয়েছে।
দুই দিনে দুই দফা বদলি, রায়পুরের বিতর্কিত ইউপি সচিব এবার রামগঞ্জে
_
দুই দিনে দুই দফা বদলি আফসারের_
রায়পুর উপজেলার ৮ নম্বর দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আফসার উদ্দিনকে মঙ্গলবার প্রথমে কমলনগর উপজেলার চর ফলকন ইউনিয়ন পরিষদে বদলি করা হয়। এর দুই দিন পর বৃহস্পতিবার তাঁকে রামগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদে বদলি করা হয়।
আফসার উদ্দিনের বিরুদ্ধে জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় অতিরিক্ত টাকা নেওয়া এবং বিভিন্ন বরাদ্দ ও সেবায় কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউপি সদস্যদের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধন, মাতৃত্বকালীন ভাতা, জেলেদের বরাদ্দের চাল, গ্রাম পুলিশের ট্যাক্স, ইউপি সদস্যদের সম্মানী এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত টাকা বা কমিশন নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ‘শূন্য বয়সের বাচ্চা’ দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন করানোর অভিযোগও করেন কয়েকজন জনপ্রতিনিধি।
এসব অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসন তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলমান থাকার মধ্যেই তাঁকে বদলি করা হলো।
স্থানীয় সরকার শাখার সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমানের সই করা অফিস আদেশে বৃহস্পতিবার আফসার উদ্দিনকে রামগঞ্জের কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদে বদলির বিষয়টি জানানো হয়।
দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, ‘কীভাবে সচিবের বদলি হয়েছে, তা আমার জানা নেই। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ছিল। সেসব অভিযোগের তদন্ত চলছে।’
তদন্ত চলমান অবস্থায় বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার শাখার সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, ‘এটা অফিসিয়াল প্রসিডিউরের অংশ। মাঝে মাঝে জনস্বার্থে আমরা এ ধরনের বদলি করে থাকি।’
মানববন্ধনের পর মাসুদ আলম রায়পুরে
অন্যদিকে রামগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মাসুদ আলমকে বৃহস্পতিবার রায়পুর উপজেলার ৯ নম্বর দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়ন পরিষদে বদলি করা হয়।
বদলির আদেশের দিন সকালেই কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিতে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে হতো। ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও কমিশন দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকা দিতে কেউ অপারগতা প্রকাশ করলে তাঁকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হতো। এতে সরকারি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন।
প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাঁদের দাবি, মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে এর আগেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এর আগে ইছাপুর ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত থাকাকালেও স্থানীয়দের সঙ্গে তাঁর বিরূপ আচরণের অভিযোগ ছিল।
মানববন্ধনের পরপরই মাসুদ আলমকে কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রায়পুরের দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়ন পরিষদে বদলি করা হয়।
তবে মানববন্ধন বা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে বদলির সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেনি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে মাসুদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে কবে?
রায়পুর ও রামগঞ্জের দুই সচিবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ধরন প্রায় একই নাগরিক সেবা ও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে অতিরিক্ত অর্থ বা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ। তবে দুজনের ক্ষেত্রেই অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়।
আফসার উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে। সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে রামগঞ্জে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর মানববন্ধন হয়েছে এবং একই দিনে তাঁকে রায়পুরে বদলি করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বদলি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে অভিযোগের কারণেই তাঁদের বদলি করা হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তবে একই ধরনের অভিযোগে থাকা দুই সচিবকে পরস্পরের উপজেলায় বদলি করার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, শুধু কর্মস্থল পরিবর্তন না করে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এখন দুই সচিবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যন্ত কী ফল দেয় এবং নতুন কর্মস্থলে তাঁদের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের নতুন অভিযোগ ওঠে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।


