জুনে সমাপ্ত অর্থবছরের সমাপনী বা ‘জুন ক্লোজিং’-এর অজুহাতে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই জুন মাসে পকেটে ঢুকেছে শতভাগ বিল। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে সেপ্টেম্বরে পা দিলেও লক্ষ্মীপুর প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) দুটি ভবনের নির্মাণকাজ পড়ে ছিল আধাখেঁচড়া অবস্থায়। সম্প্রতি গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত দুর্নীতির তথ্য চাউর হতেই তড়িঘড়ি শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। অনিয়ম ঢাকতে এখন জোরকদমে চলছে চোখধাঁধানো ‘দৃশ্যমান’ কাজের কসরত। তবে জালিয়াতি ঢাকার এই তড়িঘড়িতেও থামেনি নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের উৎসব।
সরেজমিনে দেখা যায়, শতভাগ বিল উত্তোলনের খবর ফাঁস হওয়ার পর প্রকল্প এলাকায় হুট করেই কাজের তোড়জোড় বাড়ানো হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, যেকোনো মূল্যে ‘কাজ চলছে’ তা জাহির করা। কাজের গতি বাড়লেও কমেনি অনিয়মের তীব্রতা; একাডেমিক ভবন ও মহিলা হোস্টেলের ঢালাইয়ে এখনো অনায়েসে ব্যবহার করা হচ্ছে মরিচা ধরা পুরোনো রড। আর পলেস্তারায় সিমেন্টের অনুপাত কম দিয়ে বালুর পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ায় হাত না দিতেই খসে পড়ছে প্লাস্টার।
পুরো নির্মাণযজ্ঞে নেই কোনো কারিগরি তদারকি। সাইটে দেখা মেলেনি কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর। ফলে ঠিকাদার তার ইচ্ছেমতো যেনতেনভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এলজিইডি কর্মকর্তারা পুরো বিষয়টি দেখেও রহস্যজনক নীরবতা পালন করছেন। দ্রুত দৃশ্যমান ফল পাওয়ার তাড়নায় ঠিকাদারের এই একক আধিপত্য ও খামখেয়ালি নীরবে মেনে নিচ্ছেন তারা।
এদিকে সংবাদ প্রকাশের পর কাজের গতি দেখালেও সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে চরম ক্ষুব্ধ ঠিকাদার পক্ষ। নির্মাণকাজে নিম্নমানের রড-বালু ব্যবহারের ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের প্রবেশে সরাসরি বাধা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে ঠিক কী গোপন করতে সাংবাদিকদের ছবি তোলায় এই বিধিনিষেধ, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, পরিমাপ বই (এমবি) যাচাই, কাজের গুণগত মান পরীক্ষা ও চূড়ান্ত প্রত্যয়ন পত্র ছাড়া ফাইনাল বিল পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু গত জুন মাসেই কাজ অসম্পূর্ণ রেখে ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার শতভাগ বিল ছাড় করা হয়। জুন পেরিয়ে সেপ্টেম্বরের দোরগোড়ায় এসে এখন লোকদেখানো কাজ নিয়ে ব্যস্ততা দেখালেও ভেতরে প্রকৌশলগত তদারকির বালাই নেই। কারিগরি তদারকিহীন এই লোকদেখানো কর্মযজ্ঞ নিয়ে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর জেলা সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, “জুন মাসে শতভাগ বিল তুলে নিয়ে সেপ্টেম্বরে এসে তড়িঘড়ি কাজ করাটাই প্রমাণ করে এখানে বড় ধরনের জালিয়াতি হয়েছে। পরিমাপ বই (এমবি), কোয়ালিটি টেস্ট রিপোর্ট ও বিল ছাড়ের অনুমোদন নথিগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।”
তিন মাস আগে শতভাগ বিল পাস হওয়ার পরও সেপ্টেম্বরে এসে তাড়াহুড়ো করার বিষয়ে কোনো সদুত্তোর দিতে পারেননি ঠিকাদার বেলাল হোসেন। তবে বিল নেওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “আমি ফাইনাল বিল নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু কাজ তো ফেলে রেখে যাইনি। দ্রুত ফিনিশিং দিয়ে দিচ্ছি।”
কাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জুন মাসে পুরো বিল ছাড় হলো, এ প্রশ্নে মুখ কুলুপ এঁটেছেন লক্ষ্মীপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী। শতভাগ বিল পরিশোধের সত্যতা মেনে নিলেও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান এই কর্মকর্তা।


