লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের গত ২০ বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম চিত্র বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি খাতে অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। অস্তিত্বহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্প, ভুয়া বিল, মসজিদ সংস্কার ও নামসর্বস্ব প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া জেলা পরিষদের কয়েকশ কোটি টাকা মূল্যের জমি ও মার্কেট বেদখল হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রায়পুরে জেলা পরিষদের সামনে সৌন্দর্য নষ্ট করে একটি বহুতল মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুন নাহার জানান, এই মার্কেট থেকে কোনো অর্থই সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক চেয়ারম্যানরা দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ইচ্ছেমতো লুটপাট চালিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রায়পুর-হায়দরগঞ্জ সড়কের পীরবাড়ির সামনে দেনায়েতপুর এলাকায় জেলা পরিষদের প্রায় ২০ শতাংশ জায়গায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি বহুতল মার্কেট নির্মাণ করা হয়। মার্কেট নির্মাণের সময় জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা মিলে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ ২১ জনের কাছ থেকে ৬ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন।
নির্মাণকাজে বিপুল ব্যয় দেখানো হলেও জেলা পরিষদের কাছে এর কোনো সঠিক তথ্য নেই। কত টাকার বিল হয়েছে বা বিল পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তার কোনো নথি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই অনিয়মের সঙ্গে সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত মো. শাহজাহান, তাঁর ছেলে এবং রায়পুরের কয়েকজন ঠিকাদারের নাম জড়িয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু মার্কেটই নয়, রায়পুরে পাঁচটি যাত্রী ছাউনি, মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুল সংস্কারের নামেও বিপুল অর্থ লোপাট করা হয়েছে। এমনকি জেলা পরিষদের বাসভবন সংস্কার ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার তহবিল থেকেও টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
সম্প্রতি রায়পুরের এই বহুতল মার্কেটের বেশ কিছু দোকান প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দখলে চলে গেছে। দোকান বরাদ্দ পাওয়াদের একজন, রায়পুর পৌরসভার কর্মকর্তা কামরুল হাসান রাসেল বলেন, “২০২৩ সালে জেলা পরিষদ সদস্য মামুন বিন জাকারিয়ার মাধ্যমে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে স্ত্রীর নামে একটি দোকান বরাদ্দ নিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো কাগজপত্র পাইনি। কয়েক দিন আগে এক যুবদল নেতা সেটি দখল করে নিয়েছেন।”
একই অভিযোগ করেন সংবাদকর্মী ওয়াহিদুর রহমান মুরাদ। তিনি জানান, ৬ লাখ টাকা দিয়ে স্ত্রীর নামে দোকান নিয়েছিলেন তিনি, যা সম্প্রতি বেদখল হয়েছে। অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগ নেতা ও বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও অর্থের বিনিময়ে এখানে দোকান নিয়েছিলেন, যাদের অনেকে আবার দোকান বিক্রিও করে দিয়েছেন।
এসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য জেলা পরিষদের রায়পুর এলাকার সাবেক সদস্য মামুন বিন জাকারিয়া ও সাখাওয়াত হোসেন আরিফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা আত্মগোপনে থাকায় কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক সাহাবুদ্দিন সাবু বলেন, “সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রশাসকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। তাদের মাধ্যমেই এই বিপুল অর্থের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। রায়পুরের মার্কেটটি আমরা পরিদর্শন করব এবং সব অনিয়ম খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
(চলবে…)


