দেশের নির্মাণ শিল্পের ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে পরিচিত ইটভাটাগুলো এখন শ্রমিকদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে লক্ষ্মীপুরের প্রায় দুই শতাধিক ইটভাটায় কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টা বিষাক্ত ধোঁয়া, ধুলাবালি ও প্রচণ্ড উত্তাপের মধ্যে কাজ করায় অকালেই পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেকে।
সরেজমিনে লক্ষ্মীপুর জেলার বেশ কয়েকটি ইটভাটা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ শ্রমিকের মুখে নেই মাস্ক, হাতে নেই গ্লাভস। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী, শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক। বাস্তবে এসব নিয়ম কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে অভাবের তাড়নায় শিশু ও নারী শ্রমিকরাও এই বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, ইটভাটায় কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইড সরাসরি শ্রমিকদের ফুসফুসে প্রবেশ করছে। দীর্ঘ সময় এই ধোঁয়া ও ধুলার মধ্যে থাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা ও ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করায় বাড়ছে হিট স্ট্রোক ও পানিশূন্যতার ঘটনা।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, ‘ইটভাটার ধূলিকণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার এতটাই ক্ষুদ্র যে তা সরাসরি রক্তে মিশে যেতে পারে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না হওয়ায় এসব রোগ পরবর্তী সময়ে জটিল আকার ধারণ করছে।’
ইটভাটায় একজন শ্রমিককে মাথায় করে একসঙ্গে ১০ থেকে ২০টি কাঁচা বা পোড়া ইট বহন করতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই ভারী বোঝা বহনের ফলে শ্রমিকদের মেরুদণ্ড ও হাড়ে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা কোমরের ব্যথায় সবচেয়ে বেশি ভুগছেন।
কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নের মনির হোসেন (৫৮) গত ১০ বছর ধরে ইটভাটায় কাজ করছেন। এবার ৯৬ হাজার টাকায় নিজের শ্রম বিক্রি করেছেন ‘মা আয়েশা ব্রিকস’ নামের একটি ভাটায়। তিনি বলেন, ‘সারাদিন ইটের রাবিস আর ধুলা পেটে যায়। মালিকপক্ষ আমাদের কোনো খোঁজ রাখে না। এখন শ্বাসকষ্ট আর কোমরের ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারি না।’
একই চিত্র সদরের চর রমনী মোহন ইউনিয়নের বিবি ফাতেমা ও সালাহ উদ্দিন দম্পতির। সাত বছরের সন্তান নিয়ে ২ লাখ টাকায় আগাম শ্রম বিক্রি করেছেন তারা। সালাহ উদ্দিন জানান, মেরুদণ্ডের ব্যথার চিকিৎসা করাতে গিয়ে ইতিমধ্যে ৬০-৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ঋণের বোঝা মাথায় থাকায় অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
ইটভাটায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন নারী ও শিশুরা। বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে গর্ভবতী নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্য ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়ছেন। অন্যদিকে ধুলাবালির মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা শৈশবেই নিউমোনিয়া ও চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
ইটভাটার শ্রমিক সর্দার বাবুল মাঝি স্বীকার করেন, মালিকপক্ষ থেকে কোনো স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বা সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয় না। প্রশাসন কঠোর না হলে মালিকরা সচেতন হবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবেশ কর্মকর্তা হারুন উর-রশিদ জানান, সরকারি হিসেবে জেলায় ইটভাটার সংখ্যা ১৩৮টি। তিনি বলেন, ‘ছাড়পত্রের শর্তানুযায়ী সুরক্ষা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক। কন্ট্রাক্টর বা মাঝিদের মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ায় সচেতনতার অভাব দেখা যায়। আমরা মালিকদের এ বিষয়ে আরও কঠোরভাবে তাগিদ দেব।’
শ্রম অধিকারকর্মীদের মতে, প্রচলিত ইটভাটার পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ‘ব্লক ইট’ এবং আধুনিক চিমনি প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। শ্রম আইন অনুযায়ী নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।




