‘যার জমি আছে, ঘর নেই’ অসহায়দের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে লক্ষ্মীপুরের ৬টি উপজেলায় ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়। কিন্তু গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বরাদ্দ দেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘর স্বচ্ছল পরিবার লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের -স্বজনদের। ২০২৪ সালে ৫ আগষ্ট সরকার পতনের পর প্রশাসনের কোন তদারকি না থাকায় এসব আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এখন মাদক এর আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। কোন ব্যাক্তি প্রতিবাদ করলে হতে হচ্ছে লাঞ্চিত হতে হয় বলে বসবাসকারি একাধিক ব্যাক্তি অভিযোগ করেন।
এছাড়াও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ডিপটিউবওয়েল নেই, চুরি হয়ে গেছে, থাকলেও পানির সমস্যা, কবরস্থান-শ্বশ্বান নেই, চরম জলাবদ্ধতা,
পুকুর থাকলেও ঘাটলা ভাঙ্গা, পুকুর পাড়ের কয়েকটিঘর ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।।
রায়পুরে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ১২৪টি ঘরে কেউ না থাকায় নতুন করে বরাদ্ধ চেয়ে আবেদন জানানো হয় বলে জানান রায়পুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) নিগার সুলতানা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি খাস জমিতে প্রায় ৫০০ বর্গফুটের প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে দুটি বেড রুম, একটি করে রান্না ঘর, ইউটিলিটি রুম, টয়লেট ও বারান্দা। দুর্যোগসহনীয় এসব ঘর হবে টেকসই ও প্রতিটি ঘরেই থাকবে সোলার সিস্টেম আর বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা। প্রতিটি সেমিপাকা ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। ইটের দেয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং রঙিন টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি সব বাড়ি সরকার নির্ধারিত একই নকশায় হয়।।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে রায়পুরে ‘যার জমি আছে, ঘর নেই’ তাদের জন্য ৪৬৭টি ঘর নির্মাণ বাবদ বরাদ্দ আসে। যার মধ্যে প্রথম শ্রেণির ঘর পাবেন, যাদের জমি নেই ও ঘরও নেই তাদের। বিশুদ্ধ পানি, কবরস্থান ও জলবদ্ধতাসহ নানা সমস্যায় চরম দুর্ভোগে রয়েছে আশ্রয়নবাসীরা।
রায়পুর উপজেলার ৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ( বামনী ইউনিয়নের বাংলাবাজারে ৯৪টি, শিবপুরে ১০টি, কেরোয়া ইউনিয়নের মীরগঞ্জ বাজারের পাশে ৯টি, দক্ষিণ চরবংশী ইউপির মেঘনা নদী সংলগ্ন মিয়ারহাটে ৪৫টি, হাজিমারা পুলিশ ফাঁড়ির পাশে ৪৪টি, কারিমিয়ায় মাদরাসার পাশে ১১৭টি, উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের কুচিয়ামারায় এলাকায় ২৪টি, মদিনাবাজার এলাকায় ৪৩টি, দক্ষিণ চর আবাবিল ইউপির উদমারা গ্রামে ৭৯টিসহ মোট ৪৬৭টি ভূমিহীন পরিবারকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে ঘরে উঠতে অনীহা প্রকাশ করেছেন উপকারভোগীরা। ৩৪৩টিতে মানুষের বসবাস। বাকি ১২৪টি ঘরে ঝুলছে তালা। যারা বরাদ্ধ নিয়েছেন, তারা নীজেদের বাড়ীতেই বসবাস করছেন। এছাড়া রয়েছে বিশুদ্ধ পানির সমস্যা। নীজস্ব পুকুর ও কবরস্থানও নেই। একাধিকবার ইউএনও ও সহকারি কমিশনার এর কাছে আবেদন করলেও পাত্তা দেয়া হয়না।
৮টি আশ্রয়কেন্দ্রের তালাবদ্ধ ঘরগুলো হলো ১২৪টির মধ্যে-বামনী ইউপির বাংলাবাজার এলাকায় ৪০টি, দক্ষিন চরবংশী ইউপির মিয়ারহাট এলাকায় ১৪টি, হাজিমারা আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪টি, উত্তর চরবংশী ইউপির মদিনা বাজার এলাকায় ১৩টি, কুচিয়া মারা এলাকায়, ৮টি, চরআবাবিল ইউপির উদমারা গ্রামে ১১টি ও কারিমিয়া এলাকায় ২৪টি ঘর।
অভিযোগে জানাযায়, দক্ষিন চরবংশীর ইউপি সদস্যরা হাজিমারা ও মিয়ারহাট এলাকায় ঘর পাওয়া ২৫ জনের কাছ থেকে ৬-১০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। উপজেলা ভূমি অফিস দলিল রেজিস্ট্রি খরচ হিসেবে নিয়েছে ১২০০ টাকা। শুধু তা-ই নয়; ঘর পাওয়াদের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে বিনাপয়সায় মাটি কাটা ও ভরাটের কাজসহ শ্রমিক হিসেবেও খাটিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ- প্রকল্পের আওতায় এ ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।
দক্ষিণ চরবংশি ইউনিয়নে দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে জমি-ঘর-বাড়ি যাদের আছে—এমন মানুষদের ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন চেয়ারম্যান ও মেম্বার। ঘর বরাদ্দ দেওয়া পরিবারগুলোর কাছ থেকে ৬-থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ইউনুসের পোলের গোড়া নামক এলাকার আবদুর রহিম ভুঁইয়ার স্ত্রী লাকি বেগমকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়। ইউপি সদস্য লিটন গাইনের বোন হন লাকি বেগম। লাখি বেগমের বাড়ীতে ২০ শতাংশ জমিজুড়ে একটি টিনশেড ঘর ও বাগান রয়েছে। তার বাবারবাড়ি থেকেও সম্পদের ভাগ পেয়েছেন। স্বামী থাকে সোনাপুর ইউপির রাখালিয়া গ্রামে।
তালিকার নাম রয়েছে একই ইউনিয়নের কালু বেপারির হাট এলাকার মুনর্শিদা ও তার স্বজন আয়েশা বেগমের নাম, যারা সম্পর্কে আপন নানি ও নাতিন। তাদের পরিবারের বসতভিটায় টিনশেড ঘর রয়েছে। আবাদি জমি ও কর্মজীবী হওয়ায় তাদের পরিবারে সচ্ছলতা আছে। অথচ ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদের নামে।
চরবংশী কালু বেপারিরহাট গ্রামে ইউপি সদস্য দুলালের বসতঘরের সামনে জয়নালের স্ত্রী তাজিয়া বেগম ও তার ২০০ গজ পাশেই মমিন তালুকদার। তাদের নামেও ঘর বরাদ্দ হয়, যারা মূলত সচ্ছল এবং তাদের ঘর ও জমি রয়েছে।
আখনবাজার এলাকার লোকমান ফরাজি ও শুক্কর সর্দারের অবস্থাও একই। শুক্কর সর্দারের মেয়েই জানে না তাদের নামে ঘরবরাদ্দ হয়েছে।
এ ব্যাপারে সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া ও দক্ষিণ চরবংশী ইউপির সমাজ সেবক মনির হোসেন মোল্লা বলেন, তখনকার সময়ে প্রায় ঘরগুলো বরাদ্ধেই অনিয়ম হয়েছে। উপজেলা ভূমি অফিস ও ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বাররা টাকা নিয়ে ঘরগুলো বরাদ্ধ দিয়েছেন। প্রতিদিন সন্ধার পর থেকে মধ্য রাত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর মাদকের জমজমাট আড্ডা চলে বলে শুনেছি। ইউনিয়নে খোঁজ নিলে সত্যতা পাওয়া যাবে।
দক্ষিণ চরবংশি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সালেহ মিন্টু ফরাজি বলেন, অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে নিম্নমানের কাজ হয়েছিলো। মেঝে ও বারান্দায় মাটি ভরাটের জন্য বরাদ্দ পাওয়া দের কাছ থেকে ৬-১০ হাজার টাকা করে মেম্বারদের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। নিজেদের ঘর হওয়ায় আবার অনেকেই বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমিকের কাজ করছেন। রেজিস্ট্রির জন্য ভূমি অফিস ১২০০ টাকা করে নিয়েছিলেন।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদি হাসান কাউছার বলেন, আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে ১২৪টি ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে। তালিকায় সচ্ছল ব্যক্তি থাকলে তাদের বাদ দিয়ে প্রকৃত গৃহহীনদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হবে।
খুব সহসায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে ব্যাবস্থা নেয়া হবে। এবিষয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবদুল হাই খান বলেন, আমার আগের কর্মকর্তা (প্রকৌশলী) আশিকুর রহমান এই ঘরগুলো করেছেন।


