গত রবিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২১তম বৈঠকে লেজিসলেটিভ বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ,২০২৬’ নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত একজন জানিয়েছেন, বর্তমানে জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলমান না থাকায় এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি হবে। পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে সেটি আইনে পরিণত হবে।
এতে নতুন উদ্যোক্তাদের সরকারি কেনাকাটার টেন্ডারে যুক্ত হওয়ার পথ সহজ হবে বলে জানিয়েছেন আইনটির সংশোধন প্রস্তাবকারী বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পাবলিক প্রক্রিউরমেন্ট অথরিটির (পিপিএ) উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল অফিসাররা। তবে বিশেষ খাতের কাজের কার্যাদেশের প্রকৃতি, জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে আলাদা শর্ত আরোপ করার ক্ষমতাও সরকারের হাতে থাকবে।
এই সময়ে এ ধরণের উদ্যোগের কারণ জানতে চাইলে আইএমইডি উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানায়, বিদ্যমান টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় বড় অংকের টেন্ডারে অংশ নিতে গেলে অতীতে বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের বার্ষিক লেনদেন থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ আমলে যারা কাজ পেয়েছেন, অভিজ্ঞ হিসেবে তারাই এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ পেতে সরকার আইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রস্তাবিত এই সংশোধন অধ্যাদেশে যেকোনো আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নিতে হলে বিদেশি ঠিকাদারি বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দেশীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে, অনিয়মের অভিযোগে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার আগে লিখিত কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমান আইনে নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, প্রস্তাবিত এসব সংশোধন কার্যকর হলে সরকারি কেনাকাটায় বহুল আলোচিত সিন্ডিকেটপ্রথা ভাঙবে এবং স্বচ্ছতা ও সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে বিএনপি সরকারের ঠিকাদাররা যেন সহজে সরকারি কেনাকাটা এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে— এমন সমালোচনাও আছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংশ্লিষ্ট খাতে যদি নতুন কোনো দরদাতার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকে এবং তিনি নির্ধারিত কারিগরি শর্তাবলি পূরণ করতে পারেন, তবে এই বিধানটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে।
‘অন্যথায়, পর্যাপ্ত প্রাসঙ্গিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার একটি ঝুঁকি থেকে যায়,’ বলেন তিনি।
বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্রয়কারী সংস্থাকে ‘বিশেষ শর্ত’ আরোপ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এতে একই ধরনের পক্ষপাতিত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘আইনটি সংশোধনের জন্য অংশীজনেরা (স্টেকহোল্ডার) দীর্ঘদিন ধরে সুপারিশ করে এলেও কোনো ধরনের আলোচনা বা অংশীজনদের যুক্ত না করে সরকার একতরফাভাবে তা সংশোধনে তড়িঘড়ি করছে বলে মনে হচ্ছে—যা হতাশাজনক।’
‘এতে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়,’ যোগ করেন তিনি।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে আরও বেশি প্রতিযোগিতা সৃষ্টিসহ দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষায় আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির কার্যপ্রণালির আধুনিকায়ন, টেকসই ক্রয় ব্যবস্থার অধিক সংস্থানের লক্ষ্যে পণ্য, কার্য ও ভৌতসেবা কিনতে নির্ণায়কের অনুপাতভিত্তিক মূল্যায়ন (আন্তর্জাতিকভাবে বহুল চর্চিত রেটেড ক্রাইটেরিয়া ধারণার সমার্থক)’ সম্ভব হবে। সূত্র : ডেইলি স্টার


