রামপুরা টিভি সেন্টার থেকে হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত দূরত্ব মাত্র ১ দশমিক ১ কিলোমিটার। অথচ এই দূরত্ব পাড়ি দিয়ে গাড়ির জন্য কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) সংগ্রহ করতে প্রতিটি গাড়িকে অন্তত চার ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। দুপুর সাড়ে ১২টায় অটোগ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়ানো এক চালক গ্যাস পেয়েছেন বিকেল সাড়ে ৪টায়। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও মিলেছে মাত্র ৫০২ টাকার গ্যাস, যা ওই গাড়ির সিএনজি সিলিন্ডারের প্রায় ৬০ শতাংশ।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর রামপুরা টিভি সেন্টার থেকে হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারগুলো সারিবদ্ধভাবে সড়কে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ এই লাইনের শেষ মাথা গিয়ে ঠেকেছে রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় কাজের বড় একটি সময়ই গ্যাস সংগ্রহে চলে যাচ্ছে চালকদের।
গাড়িচালক ও ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক চালককে একই দিনে দুইবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ফলে শুধু গাড়ির জ্বালানি সংগ্রহ করতেই ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় ব্যয় হচ্ছে। এতে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনেও সংকট তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, পর্যাপ্ত গ্যাসের প্রেসার না থাকায় গাড়িতে স্বাভাবিক পরিমাণ গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু কম গ্যাস সরবরাহ হলেও গ্যাস গাড়িতে প্রবেশ করানোর জন্য ফিলিং স্টেশনের প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি চালাতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ বাড়ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন স্টেশন মালিকরা।
দুপুর দেড়টার দিকে রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়ান প্রাইভেটকার চালক তামিম। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আড়াই ঘণ্টায় মাত্র আধা কিলো সামনে আগাতে পেরেছি। চিন্তায় আছি ছয়টার আগে গ্যাস পাই কিনা। কারণ ৬টা থেকে আবার ৯টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। গাড়িতে গ্যাস ভরার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমার গাড়ির সিলিন্ডারের ৬০০ টাকার গ্যাস ঢুকে। কিন্তু ফিলং স্টেশনে গ্যাসের প্রেসার কম থাকার কারণে সর্বোচ্চ ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকার মধ্যে গ্যাস ঢুকে। এটা দিয়ে সর্বোচ্চ ২০০০ টাকার ট্রিপ দিতে উবারে। এর পরে আবার ৪-৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয় গ্যাসের জন্য। যখন পুরা ৬০০ টাকার গ্যাস নিতে পারতাম, তখন অন্তত তিন হাজার টাকার ট্রিপ দিতে পারতাম। কিন্তু এখনো সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

আরেকটু সামনে এগিয়ে বেটার লাইফ হসপিটালের সামনে কথা হয় সিএনজি চালক জামালের সঙ্গে। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাধারণ সময়ের আমার সিএনজি সিলিন্ডারের ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার গ্যাস ঢুকে। ওটা দিয়ে মোটামুটি দিন পার করা যায়। পরে রাতের দিকে আবার সিরিয়ালে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু এখন গ্যাস ঢুকে সর্বোচ্চ ১২০ থেকে ১৫০ টাকার। এটা দিয়ে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনটা ট্রিপ মারতে পারি। এরপরে আবার গেছে লাইনে এসে দাঁড়াতে হয়।
তিনি আরও বলেন, এখন যদি দুই তিন ট্রিপ মারার পর আবার এসে তিন-চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়, তাহলে আমি আসলে দিনে কতক্ষণ সিএনজি চালাতে পারি আপনি বলেন? এখন দেখবেন রাস্তার চেয়ে বেশিরভাগ সিএনজি লাইনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে।
এরপর হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনটির চারটি নোজলের মধ্যে দুটি নোজল বন্ধ। বাকি দুটি নোজল দিয়ে দুই সারিতে সিএনজি অটোরিকশা ও গাড়িতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। নোজলের সংখ্যা কম থাকায় গ্যাস গাড়িতে সরবরাহের গতি ধীর হয়ে গেছে। ফলে স্টেশন থেকে তৈরি হওয়া দীর্ঘ লাইন রামপুরা টিভি সেন্টার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।
সেখানে একটি গাড়িতে ৫০২ টাকার গ্যাস ঢোকার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ওই গাড়ির চালক আসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি দুপুর সাড়ে ১২টায় টিভি সেন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার গাড়িতে প্রায় সাড়ে ৮০০ টাকার গ্যাস ঢুকে। আমি মাত্র ৫০২ টাকার গ্যাস পেলাম। এখন একটু প্রেসার বেশি থাকায় এতটুকু পেয়েছি, অন্য সময় তো ৪০০ টাকার বেশি পাই না। এটা দিয়ে হয়ত আজকে রাত পর্যন্ত চালাতে পারব। কিন্তু সেই সকালের জন্য রাতে আবার এসে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তখন কতটুকু গ্যাস পাব জানি না।

হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে দুটি নোজল বন্ধ করার পর বাকি দুটি নোজলে ১৮০ বার (২ হাজার ৬১১ পিএসআই) গ্যাসের চাপ রয়েছে। এটি মাঝারি মানের চাপ। গ্যাসের চাপ ২১০ থেকে ২৫০ বার থাকলে গাড়িতে তুলনামূলকভাবে ভালো পরিমাণ গ্যাস ঢোকে। কিন্তু ১৮০ বার চাপ থাকায় স্বাভাবিক পরিমাণ গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক সময় চাপ আরও কমে গেলে গাড়িতে আরও অল্প পরিমাণ গ্যাস ঢোকে।
ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা আরও বলেন, একটি নোজল চালু থাকলেও ফিলিং স্টেশনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মেশিন চালাতে হয়। চারটি নোজল চালু থাকলেও একই পরিমাণ মেশিন চালাতে হয়। ফলে কম পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করেও বিদ্যুৎ খরচের ক্ষেত্রে খুব একটা কমছে না। এতে গ্যাস বিক্রির তুলনায় পরিচালন ব্যয় বেড়ে গিয়ে ফিলিং স্টেশন মালিকদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকার ব্র্যাক ইন-এ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘ন্যাভিগেটিং বাংলাদেশ’স এনার্জি ক্রাইসিস : ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু আ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাসটা দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্টটা করা। এছাড়া আপনিই বলেন আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।
সংকট নিরসনে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং…এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। কারণ, এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ, আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না।
তিনি বলেন, এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। তবে মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। কারিগরি সমন্বয়ের জন্য তখন পুরো সিস্টেমটি টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন বন্ধ রাখা লাগবে। যার প্রভাবে সাময়িকভাবে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেবে।

