ভবিষ্যতের টানে পৃথক হয়ে গিয়েছিল তাদের গন্তব্য। বন্ধুর সঙ্গে ‘দেখা-দেখি’টা কারও কারও জীবনে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের পর্দাতেই। কারও তো আবার-স্কুল জীবনের শেষ দিনে পথটা যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল তারপর আর মুখ দেখাদেখিই হয়নি। সেই সমস্ত হারিয়ে যাওয়া পথগুলো ফের পুরোনো মোহনায় ফিরেছিল শনিবার (৪ ফেব্রুয়ারী)।
বহুদিন পর প্রিয় লক্ষ্মীপুর সদরের দালালবাজার কামানখোলা জমিদার বাড়ীর আঙ্গিনায় এসে তারা যেন ফিরে গিয়েছিলেন সেই ‘আকাশি ইউনিফর্মে’ বন্দি থাকার সোনালী দিনগুলোতে। উপলক্ষ একটাই-বন্ধুদের প্রানেরমেলা (পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান।
তারা সবাই যে এক সময় রায়পুর এলএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় এবং সরকারি মাচ্চেন্টস একাডেমির শিক্ষার্থী ছিলেন, পাশাপাশি বসতেন ক্লাসরুমে। খেলাধুলাও করতেন। বহুদিন পর স্কুলে ফেরায় শনিবার ভরদুপুরে তাই স্কুল প্রাঙ্গণের এপাশ-ওপাশে ঘুরে প্রাক্তনদের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসছিল অজস্র আবেগি সংলাপ।
তার কোনটা এমন-‘বন্ধু কী খবর বল, কতদিন পর দেখা,’ ‘ স্কুলের মাঠেই তো খেলে বেড়াতাম আমরা, আজ চেনায় যায় না’, ‘ আজ রং লেগেছে দেয়ালে দেয়ালে। ’ তোদের জীবনে।
সকলে ১৯৯৬-৯৭ সাল এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা । প্রতিবছর বিশেষ ছুটির দিনে অনুষ্ঠিত হয় পুনর্মিলনী।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন মেধাবী ছাত্র বোরহান হোসেন, কামরুল আল মামুন, যুগান্তর সাংবাদিক তাবারক হোসেন আজাদ, মোঃ রাজু, মোঃ সোহেল, প্রতিবন্ধি কল্যান সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সাইফুল ইসলাম, কাউন্সিলর আবু নাসের বাবু, সোহেল আলমসহ আরও অনেকের সহযোগিতায় এই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।
পুনর্মিলনী উপলক্ষে স্মৃতিচারন, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-আয়োজনে বাকি ছিল না কিছুই। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রায়পুর পৌরসভার মেয়র গিয়াস উদ্দিন রুবেল ভাট, লন্ডন প্রবাসী মোঃ হাসান, বিশিষ্ট সমাজ সেবক কামরুল আল মামুন, ব্যাবসায়ী বোরহান উদ্দিন ও রুপম প্রমুখ।
পুনর্মিলনীতে প্রাক্তন ছাত্রদের অনেকেই বর্তমানে দেশের বহু জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তারা তাদের পরিবার নিয়ে অংশ নেন পুনর্মিলনীতে।
এসময় সেই সাবেকরা যেন খুঁজে নেন তাদের স্কুল জীবনের সেইসব স্বর্ণময় দিনগুলো। চলছিলো ক্লিক ক্লিক, দেদারসে উঠছে সেলফি-ছবি। পেছনের দৃশ্যপটে পুরোনো জমিদার বাড়ী, কোথাও আবার মঞ্চস্থল। ফেলে আসা ক্লাসরুম, শিক্ষক আর হারিয়ে যাওয়া বন্ধুরা মিলে হুড়মুড়িয়ে বইতে থাকে গল্পের স্রোত।
রায়পুর এলএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষানুরাগী-সমাজসেবক কামরুল আল মামুন বলেন, ‘পুনর্মিলনীতে এসে মনে পড়ে যাচ্ছে স্কুল জীবনের সৃতি। সেদিন বন্ধুকে ছেড়ে যাওয়ার সময় বলেছিলাম একসঙ্গে থাকার। দেখা হবার। কিন্তু বাস্তবতার কারণে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়না এরপর থেকে। পুনর্মিলনীতে এসে আবার তাদের সঙ্গে । সত্যিই নস্টালজিক হয়ে পড়েছি আমরা। ’
আলোচনা সভা শেষে দুপুর থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রথমেই ৯৭ ব্যাচের এক বন্ধুর শিশু সন্তান ইসলামী সঙ্গিত গেয়ে মঞ্চ মাতিয়ে তোলেন। এরপর বন্ধুদের পরিবারের শিশুদের শিল্পীর কণ্ঠে শোনা গেল কয়েকটি গান। সঙ্গে শিশুদের মা-বাবারাও মঞ্চ মাতিয়ে তোলেন। ছিল নাচও। প্রানবন্ধুদের উৎসবে মেতেছিলেন সবাই।
ঘড়ির কাটা তখন সন্ধা ৬টা ছুঁইছুঁই। এর আগের ১০ ঘণ্টাটা যেন বার বার বলছে বন্ধুত্ব হারায় না, থেকে থেকে ফিরে আসে বন্ধুর মুখ। তাই তো যাবার বেলায় বিদায়ী মুখগুলো বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলছিল ‘আবার হবে তো দেখা, এদেখাই শেষ দেখা নয় তো?’


