রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় গরমের স্বস্তিদায়ক পানীয় হিসেবে পরিচিত ডাব এখন সাধারণ ক্রেতার জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ঢাকার বাজারে ছোট আকারের একটি ডাবের দামও ১২০–১৩০ টাকা। মাঝারি আকারের ডাব বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায়। আর বড় ডাবের দাম উঠেছে ২০০ টাকা বা তারও বেশি।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাসে আকারভেদে প্রতিটি ডাবের দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা বা তারও বেশি বেড়েছে। এই অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির কয়েকটি কারণও জানিয়েছেন তারা। এর মধ্যে সরবরাহ ঘাটতি, মৌসুমি চাহিদা, ডেঙ্গুর প্রকোপ ও পরিবহন ব্যয় অন্যতম।
রাজধানীর মুগদা, মানিকনগর, মতিঝিল, পল্টন, কমলাপুর ও খিলগাঁও এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে ছোট সাইজের ডাব একমাস আগে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন ১২০ টাকার নিচে কোনো ডাব মিলছে না। আর মাঝারি আকারের ডাব আগে ১২০-১৩০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন তা কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। আর সবচেয়ে বড় আকারের ডাব কিনতে ভোক্তাদের ব্যয় করতে হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি।
অবশ্য মহল্লার তুলনায় হাসপাতাল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে একই আকারের ডাবের দাম ২০-৩০ টাকা বেশি দেখা গেছে। হাসপাতালের সামনে ডাবের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতেও দেখা গেছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়। হাসপাতালটির সামনে সারা বছরই তিন থেকে চারজন ব্যবসায়ী ডাব বিক্রি করেন। এসব ব্যবসায়ীদের কাছে ডাবের দাম জানতে চাইলে সর্বনিম্ন ১২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হয়। পাড়া-মহল্লায় ছোট সাইজের ডাবের দাম ১২০ টাকা চাওয়া হলেও বড় সাইজের জন্য ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা দাম হাঁকানো হচ্ছে।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে একজন ক্রেতা তার আত্মীয়ের জন্য ডাব কিনে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবেদককে বলেন, রোগীর জন্য বাধ্য হয়ে একজোড়া ডাব কিনতে হয়েছে ৪০০ টাকায়। একমাস আগে একই সাইজের দুটি ডাব ২৬০ টাকায় কিনেছিলাম। এই দেশে কখন কোনটার দাম বাড়ে, তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। আর ব্যবসায়ীরাও সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সুযোগ পেলেই চড়া দামে ভোক্তার পকেট কাটতে তারা ভুল করে না।
আরেক ক্রেতার অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। রাজধানীতে কয়েকটি ভ্যান ঘুরেও তিনি ১৩০ টাকার নিচে ডাব পাননি। অথচ, একমাস আগেও তিনি ৮০ টাকায় ডাব কিনেছেন বলে জানান।
ডাবের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির কথা উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথম ১৮ দিনে দেশে ১০ হাজার ২৯১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল জুলাইয়ে, যা ৯ হাজার ২০৬ জন। অথচ চলতি মাসের ১৮ দিনেই আক্রান্তের সেই রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী বাড়ার সঙ্গে ডাবের চাহিদাও বাড়ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য রোগীদের পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পরিমাণ দৈনিক ৮-১০ গ্লাস। তবে, তরল খাবার মানেই যে শুধু ডাবের পানি খেতে হবে, তা নয়। তরলের ঘাটতি পূরণে দুধ, ফলের রস, পানি, ভাতের মাড়, ওরস্যালাইন বা বার্লিও খাওয়া যেতে পারে। ডাবের পানি শরীরের জন্য উপকারী হলেও অতিরিক্ত পান করা ঠিক নয়। কারণ, এতে উল্টো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শুধু ডাব নয়, শরীরে তরলের ঘাটতি পূরণে যেকোনো স্বাভাবিক তরল খাবারই রোগীকে খাওয়ানো যেতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করতে পারেন।
চিকিৎসকদের মতে, সোডিয়াম, পটাশিয়াম বা ক্লোরাইড শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এসব উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। শরীরে এসব উপাদান বেশি নেওয়াও ভালো নয়, আবার কম হলেও সমস্যা তৈরি হয়। ডাবের পানিতে সোডিয়াম কম, কিন্তু পটাশিয়াম বেশি থাকে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পটাশিয়াম গ্রহণ করলে তা কিডনির ওপর চাপ ফেলে। তাই অতিরিক্ত ডাবের পানি খাওয়া উচিত নয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর খাদ্যতালিকায় ডাবের বিকল্প হিসেবে স্যুপ, রঙ চা, সুজি, সেমাই, ফলের রস, বার্লি বা ভাতের মাড়ও দেওয়া যেতে পারে।
বাড়তি চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম
ডেঙ্গুর পাশাপাশি গরমের কারণেও ডাবের চাহিদা বাড়ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও যে পরিমাণ চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ডাবের সরবরাহ ঘাটতির পেছনে প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে বলেও তাদের দাবি।
কয়েকজন ডাব ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুটি বা ‘কড়া’ থেকে ডাব পরিপক্ব হতে প্রায় ৯০ দিন সময় লাগে। বর্ষার আগে গ্রীষ্মকালের তীব্র খরায় গাছে কড়া কম আসায় কয়েক মাস পর বাজারে ডাবের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বর্তমান বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে।
তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ ডাব ঢাকায় আসে। কিন্তু বর্তমান চাহিদা এর চেয়েও বেশি। সরবরাহ বাড়তে আরও প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে এর আগে বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম।
বাজারে স্বাভাবিক দাম কত হওয়া উচিত?
খুচরা বিক্রেতারাও স্বীকার করছেন, ২০০ টাকা দাম অস্বাভাবিক। তাদের মতে, চাহিদা বেশি থাকলেও একটি বড় সাইজের ডাবের দাম ১৫০–১৬০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পাইকারি বাজারে বেশি দামে কেনায় তারা কম দামে বিক্রি করতে পারছেন না।
অর্থাৎ বর্তমান বাজারে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। গাছ থেকে ডাব সংগ্রহ, স্থানীয় ব্যবসায়ী, আড়ত, পরিবহন এবং খুচরা বিক্রেতা-প্রতিটি ধাপেই দাম বাড়ছে। এই সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা না থাকলে কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানে থাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের দামের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
মুগদা হাসপাতালের সামনের খুচরা ডাব বিক্রেতা মোজাম্মেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, গ্রামের গাছিরা যে ডাব ৮০ টাকা দরে বিক্রি করেন, তা ঢাকার আড়ত থেকে তাদের ১২০ টাকায় কিনতে হয়। ওই ডাব স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য আনতে তাদের আরো ৫-৭ টাকা খরচ হয়। পরে সেটি তারা ১৪০ টাকায় বিক্রি করতে পারেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডাবের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন এই খুচরা ব্যবসায়ী। তার মতে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় চাহিদা বাড়ছে। সেই তুলনায় বাজারে সরবরাহ কম। অন্যদিকে নতুন করে গাছে ডাব আসা ও বাজারে সরবরাহ বাড়াতে সময় লাগবে। সরবরাহ বাড়তে আরও প্রায় এক মাস লাগতে পারে। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং আবহাওয়া শীতল থাকলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ ব্যবস্থাও ঠিক থাকতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো গেলে দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদক পর্যায়ের দাম, পরিবহন ব্যয়, আড়তদারি মূল্য এবং খুচরা বিক্রির দামের মধ্যে কতটা ব্যবধান-তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

