চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আট বছর বয়সি শিশু জান্নাতুল নেসা ওরফে ইরা মনিকে শ্বাসনালি কেটে হত্যা মামলায় একমাত্র আসামি বাবু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস এই রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আসামিকে এক লাখ টাকা জরিমানারও আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের রায়ে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অপরাধে আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ধর্ষণচেষ্টার অপরাধে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ফলে সব মিলিয়ে আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেন আদালত।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এপিপি অ্যাডভোকেট সারোয়ার লাভলু সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে সন্তুষ্ট। এটি একটি নৃশংস ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের বিচার। আমরা চাই, উচ্চ আদালতের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ রায় কার্যকর হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করতে কেউ সাহস না পায়।
এর আগে গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকলেও পুরো রায় লিখে শেষ করতে না পারায় আদালত আজ বৃহস্পতিবার নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের মাত্র চার মাসের মাথায় এবং অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ১০ কার্যদিবসে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই রায় ঘোষণা করা হলো, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম রায়।
মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত ইরা মনি সীতাকুণ্ড উপজেলার ছোট কুমিরা মাস্টারপাড়ার টমটম চালক মনিরুল ইসলামের মেয়ে এবং স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বাবু শেখ তাদের প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মধ্যম পুলুপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
চুয়াডাঙ্গায় জমি নিয়ে বিরোধে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
গত ১ মার্চ সকালে চকলেট কিনে দেওয়া এবং ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ইরা মনিকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যান বাবু শেখ। এরপর তাকে বাসে করে সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেনসংলগ্ন একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন বাবু শেখ। ইরা মনি চিৎকার শুরু করলে এবং বিষয়টি সবাইকে বলে দেওয়ার কথা জানালে, ক্ষিপ্ত হয়ে বাবু শেখ চাকু দিয়ে তার শ্বাসনালি কেটে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে পালিয়ে যান।
সেদিন দুপুরে ওই পাহাড়ে সড়ক সংস্কারের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা গলাকাটা অবস্থায় শিশু ইরা মনিকে জঙ্গল থেকে হেঁটে আসতে দেখেন। শ্রমিকরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩ মার্চ ভোরে শিশুটি মারা যায়।
ইরা মনির মৃত্যুর পর তার মা বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা করেন। ঘটনার পর ৩ মার্চই কুমিরা এলাকা থেকে বাবু শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেন যে, ইরা মনির বাবার সঙ্গে পূর্ব শত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবেই তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। ৪ মার্চ আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পুলিশ দ্রুত তদন্ত শেষ করে ১১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর ১৮ জুন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মাত্র ছয় কার্যদিবসে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ৩০ জুন আসামির সাফাই সাক্ষ্য নেওয়ার পর আদালত আজ এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।


