লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যবাহী দালালবাজার জমিদারবাড়ি ও খোয়াসাগর দিঘি ঘিরে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতি। ভগ্নপ্রায় স্থাপনাটির দিকে তাকালেই যেন অতীতের গৌরব, জমিদারি ঐশ্বর্য ও রাজকীয় জীবনের আবেশ অনুভূত হয়। একসময় যেখানে ছিল মানুষের পদচারণা, আলোকোজ্জ্বল আয়োজন ও প্রাণের সঞ্চারণ—আজ সেখানে নীরবতা আর ধ্বংসস্তূপ।
জেলা সদর লক্ষ্মীপুর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দালালবাজারের এই জমিদারবাড়িটি প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় চারশ বছর আগে জমিদার লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণব এ বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর আদি নিবাস ছিল ভারতের কলকাতা শহরে। পরবর্তীতে তিনি লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে এসে জমিদারি কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর নামানুসারেই অনেকের কাছে এটি লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণবের জমিদারবাড়ি নামে পরিচিত।
তবে ‘দালালবাজার জমিদারবাড়ি’ নামের পেছনেও রয়েছে ভিন্ন ইতিহাস। জানা যায়, জমিদারের বংশধরেরা ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। স্থানীয়দের ধারণা, তারা ব্রিটিশদের দালাল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেখান থেকেই ‘দালালবাজার’ নামটির উৎপত্তি।
বাড়িটির ভগ্নদশা দেখলে সহজেই অনুমান করা যায় এর একসময়ের রাজকীয় জৌলুস। বিশাল প্রবেশদ্বার, প্রশস্ত অন্দরমহল, অন্দরপুকুর, শানবাঁধানো ঘাট—সবই ছিল দৃষ্টিনন্দন। বর্তমানে পুরোনো দেয়ালজুড়ে জন্মেছে অসংখ্য পরগাছা, ঘরের ভেতর জমেছে ময়লা-আবর্জনা। জমিদারবাড়ি সংলগ্ন এলাকাজুড়ে রয়েছে নারকেল ও সুপারির বাগান, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে। বাড়ি থেকে প্রায় দুইশ গজ দূরেই অবস্থিত বিশালাকার খোয়াসাগর দিঘি।
জমিদার লক্ষ্মী নারায়ণের বংশধরেরা বাড়িটি ও দিঘি ত্যাগ করার পর পাকিস্তান আমলে একাধিক দখলচেষ্টা চালানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো চক্রই স্থাপনাটি দখল করতে পারেনি। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পর স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রশাসনের নজরে আসে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি এবং এটি পুরাতন স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২০২১ সালে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জমিদারবাড়িটির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে রক্ষায় এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে স্থানীয়রা জানান। তবে তাদের মতে, শুধু সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ নয়—সম্পূর্ণ স্থাপনাটির জরুরি সংস্কার ও সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।
প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা ধ্বংসপ্রাপ্ত জমিদারবাড়ি ও খোয়াসাগর দিঘি দেখতে ভিড় করেন।
ঈদের পরদিন রোববার (২২ মার্চ) বিকেলে জমিদারবাড়ি পরিদর্শনে আসা স্কুলশিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন,
“স্থাপনাটির কারুকাজ অত্যন্ত নান্দনিক। তবে ভেতরের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন। যথাযথ সংস্কার করা হলে এটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।”
স্থানীয় দালালবাজার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী আবিদ হাসান ও সায়মা আক্তার বলেন,
“ব্রিটিশ আমলের এই জমিদারবাড়িটি লক্ষ্মীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হলে নতুন প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে।”
তারা আরও জানান, গত বছরের ৫ আগস্টের পর জমিদারবাড়ির সামনে স্থাপিত পুলিশ ফাঁড়িটি প্রত্যাহার করা হয়। দেড় বছরেও সেখানে নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে সন্ধ্যা নামলেই এলাকাটি মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে নারী ও পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান ফোন রিসিভ করেননি।
তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইদুজ্জামান জানান,
“জমিদারবাড়ি ও খোয়াসাগর দিঘির সংস্কার ও সংরক্ষণ বিষয়ে দ্রুত খোঁজখবর নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ঢাকার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”
ঐতিহাসিক স্থাপনার যথাযথ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে কালের সাক্ষী এই নিদর্শন একসময় বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।


