দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং মেঘনা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত লক্ষ্মীপুর জেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মেধার নগরী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও স্বাস্থ্যসেবায় এই জেলাটি এখনো অনেকটা পিছিয়ে। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও লক্ষ্মীপুরবাসীর জন্য একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এখন সময়ের দাবি। মেঘনা নদীর কোলঘেষা এই জনপদে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তা কেবল চিকিৎসা ক্ষেত্রেই নয়, বরং এই অঞ্চলের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
লক্ষ্মীপুর জেলা সদর, রামগঞ্জ, রায়পুর, রামগতি ও কমলনগর- এই ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। জেলা পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যমতে, প্রায় ১,৫৩৪.৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
এই জেলার উত্তর ও পূর্বে চাঁদপুর ও নোয়াখালী জেলা, দক্ষিণে ভোলা ও বরিশাল এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী ও বরিশাল জেলা অবস্থিত। বিশেষ করে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিশাল একটি অংশ নদীবেষ্টিত হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য এখানকার মানুষকে কয়েকশ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ঢাকা বা কুমিল্লায় যেতে হয়। জরুরি অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার অভাবে পথেই প্রাণ হারান অনেক মুমূর্ষু রোগী।
মেঘনা নদীর ভাঙন কবলিত লক্ষ্মীপুর জেলা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের মূল স্রোতধারা থেকে কিছুটা পিছিয়ে। নদী ভাঙনের ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। এই অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোনো বিকল্প নেই। এটি বাস্তবায়িত হলে মেঘনার ওপারে থাকা ভোলা বা বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা অঞ্চলের মানুষও এখান থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবে।
লক্ষ্মীপুরকে বলা হয় মেধার নগরী। এ জেলার মাটি ও মানুষ জাতীয় রাজনীতি এবং প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। এ জেলায় জন্ম নিয়েছেন বর্তমান পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সাবেক সচিব ও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী পদমর্যাদায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান দায়িত্ব পালন করা ইসমাইল জবিউল্লাহ। এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ উল্লাহ, প্রখ্যাত কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, জাতীয় পতাকার অন্যতম রূপকার আ স ম আবদুর রব-এর মতো দেশবরেণ্য ব্যক্তিরা এ জেলার সন্তান। এত কৃতি সন্তানের জন্মভূমি হওয়া সত্ত্বেও একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব লক্ষ্মীপুরবাসীর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
মেডিকেল কলেজের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা গেছে।
রামগতি উপজেলার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের রামগতি-কমলনগর থেকে জেলা সদরে আসতেই দুই ঘণ্টা লাগে। সেখান থেকে আবার কুমিল্লা বা ঢাকা যাওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি। এ জেলায় একটা মেডিকেল কলেজ হলে আমরা অন্তত বাঁচার স্বপ্ন দেখব।”
রায়পুর উপজেলার দস্তগীর বলেন, “রায়পুর-রামগঞ্জ এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য চাঁদপুর বা কুমিল্লার ওপর নির্ভর করে। লক্ষ্মীপুরে মেডিকেল কলেজ হলে এই অঞ্চলের গরিব মানুষের অনেক উপকার হবে।”
চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা নারায়ণ কৃষ্ণ জানান, “চন্দ্রগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। অথচ এখানে একটি উন্নত সরকারি হাসপাতাল নেই। লক্ষ্মীপুর জেলার যেকোন স্থানে মেডিকেল কলেজ হলে আমরা আধুনিক ল্যাবরেটরি ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সেবা হাতের কাছে পাব।”
সদর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “লক্ষ্মীপুরের সন্তানরা দেশ বিদেশের বড় বড় ডাক্তার, কিন্তু নিজের জেলায় তারা সেবা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। সরকার যদি একটি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেয়, তবে এটি হবে আমাদের জন্য স্বাধীনতার পর শ্রেষ্ঠ উপহার।”
লক্ষ্মীপুর জেলাটি কেবল একটি প্রশাসনিক অঞ্চল নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। বিপুল জনসংখ্যা, ভৌগোলিক গুরুত্ব এবং মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রস্তাবিত লক্ষ্মীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দ্রুত অনুমোদন দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সরকারের ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হতে পারে মেঘনা পাড়ের এই জেলায় একটি আধুনিক মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে।



