বাম্পার ফলন হলেও আলু হিমাগারে সংরক্ষণের অতিরিক্ত ভাড়া কৃষকের সম্ভাব্য লাভ কমিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রাজশাহীর আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, আলু সংরক্ষণের ভাড়া প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৪ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে হিমাগারগুলোর প্রকৃত পরিচালন ব্যয় স্বাধীনভাবে যাচাই করে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল ১১টায় রাজশাহীর পবা উপজেলার তকিপুরে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সমিতির সভাপতি আহাদ আলী শাহ। বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি।
সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুল ইসলাম ডনি বলেন, ২০২৪ সালে প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণের ভাড়া ছিল ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা। কিন্তু ২০২৫ সালে তা এক লাফে বেড়ে ৪০০ থেকে ৪৮০ টাকায় উন্নীত হয়। এই অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধির কারণে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এরপর থেকেই যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের দাবিতে তারা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন, সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১ আগস্ট বাংলাদেশ হিমাগার মালিক অ্যাসোসিয়েশন ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করলেও তারা পরিচালন ব্যয়ের পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য তথ্য-উপাত্ত বা দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। অথচ সরকার বিভিন্ন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
ইফতেখারুল ইসলাম ডনি প্রশ্ন তুলে বলেন, সরকারি সুপারিশ কমিটির কাছে হিমাগারের প্রকৃত পরিচালন ব্যয়ের গ্রহণযোগ্য তথ্য-প্রমাণ কেন জমা দেওয়া হয়নি? তাঁর অভিযোগ, প্রকৃত ব্যয় গোপন রেখে বা অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখিয়ে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে প্রায় ৪০০টি হিমাগার রয়েছে। প্রতিটি হিমাগার যদি ১ কোটি টাকা করে তহবিল গঠন করে, তবে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০০ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কৃষক ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
বক্তারা জানান, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আন্দোলনের পর জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উদ্যোগে আলু উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে হিমাগারের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণে সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়। রাজশাহীতে কমিটি কয়েকটি হিমাগার পরিদর্শনে গেলেও আগাম অবহিত করার পরও মালিকপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পায়নি। ফলে প্রকৃত পরিচালন ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ ব্যাহত হয়।
তারা আরও জানান, জেলার ২৬টি হিমাগার পরিচালন ব্যয়ের তথ্য জমা দিলেও বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, বেতন ভাউচার, লুব্রিকেন্ট ক্রয়ের রসিদসহ কোনো দালিলিক প্রমাণ দেয়নি। ফলে রাজশাহীর প্রকৃত পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় সুপারিশ কমিটিকে নিজস্ব অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি ধারণার ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হয়েছে।
সমিতির দাবি, অন্যান্য জেলায় প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের ব্যয় ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ৪ টাকা ৩৮ পয়সা উল্লেখ করা হলেও সেসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাদের মতে, প্রকৃত পরিচালন ব্যয় প্রতি কেজিতে ২ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তাই প্রতি কেজিতে ৪ টাকার বেশি ভাড়া নির্ধারণ করা হলে তা কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য অযৌক্তিক ও অন্যায্য হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং সরকারের প্রতি প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের ভাড়া সর্বোচ্চ ৪ টাকা নির্ধারণ, হিমাগারের প্রকৃত পরিচালন ব্যয় স্বাধীনভাবে যাচাই এবং কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভোক্তার স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ ছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া নির্ধারণের দাবি প্রত্যাখ্যান করে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বাস্তবসম্মত প্রক্রিয়ায় ভাড়া নির্ধারণের জোর দাবি জানান সংগঠনের নেতারা।

