নির্মাণাধীন মসজিদের উন্নয়ন কাজ থেকে শুরু করে কালভার্ট বা গভীর নলকূপ, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ে। বিল পাসের ক্ষেত্রে ‘৫ শতাংশ’ অলিখিত কমিশন আদায়ের অভিযোগ উঠেছে খোদ উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে। এমনকি নিজের জেলায় কর্মরত থেকে প্রভাব বিস্তার ও অধীনস্থ কর্মচারীদের গালিগালাজ করারও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি একটি অনলাইন পোর্টালে এই দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সদর দপ্তর। গতকাল ১৫ জুলাই বুধবার প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের আদেশে এলজিইডির নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এস এম মহসীনকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিলে সই করার বিনিময়ে ৫ শতাংশ হারে ঘুষ দাবি করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ‘মেসার্স মনোয়ারা এন্ড ফাল্গুনি ট্রেডার্স’ নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্যাকেজ নম্বর ১২-এর আওতায় ১০টি কাজের মধ্যে মসজিদের ফ্লোর টাইলস, পুকুর ঘাটলা ও রাস্তার কাজে দ্বিগুণ পরিমাণ কাজ করেও তারা চূড়ান্ত বিল পাচ্ছেন না।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী প্রধান প্রকৌশলীর কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, চূড়ান্ত বিলের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) আদেশ থাকলেও প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন তা ঝুলিয়ে রেখেছেন। উল্টো রানিং বিল দেওয়ার নামে হয়রানি করা হয়েছে, যার ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়ে গেছে।
প্রকৌশলী ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো বিধি লঙ্ঘন করে নিজ জেলায় দায়িত্ব পালন। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা ৫নং চরপাতা ইউনিয়নের চরপাতা গ্রামে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিজ জেলায় বদলি বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুযোগ সীমিত হলেও তিনি শুধু সদর উপজেলা নয়, বরং একই সাথে নিজ জন্মস্থান রায়পুর ও চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বও সামলাচ্ছেন। এই দাপট খাটিয়ে তিনি ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, জুন ক্লোজিংকে কেন্দ্র করে অধীনস্থ প্রায় সব ঠিকাদারের কাছ থেকেই প্রায় ৫ শতাংশ হারে অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়েছে। বিল ছাড় ও দাপ্তরিক কাজের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে গিয়ে তারা এক ধরনের চাপের মুখে পড়েছেন বলেও দাবি করেন।
ঠিকাদারদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী তাদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করেন না। বিল-সংক্রান্ত কাজ বা অন্য কোনো প্রয়োজন নিয়ে অফিসে গেলেও দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা হয়। নানা অজুহাতে একসঙ্গে ১০ থেকে ১২ জন ঠিকাদারকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানো হয়। এ সময় তিনি নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার নানা দিক তুলে ধরে কথা বলেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
একাধিক ঠিকাদার বলেন, দিনের বড় একটি অংশ অফিসে অপেক্ষা করেই কেটে যায়। এতে কাজের গতি যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি মানসিকভাবেও তারা হয়রানির শিকার হন। তাদের ভাষায়, মনে হয় আমরা কোনো কাজ করতে নয়, যেন অপরাধকরে এসেছি।
গত ১৩ জুলাই (সোমবার) বেলা সাড়ে ১১টায় সরেজমিনে তার কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মচারী জানান, প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন কথায় কথায় তাদের ওপর চড়াও হন এবং অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। একজন কর্মচারী বলেন, “আমরা যেন এখানে জিম্মি হয়ে আছি। তার ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।”
অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন শীর্ষ সংবাদকে জানান, তদন্ত কমিটির বিষয়টি আমি অবগত নয়, যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে সে অপরাধী ।
তবে এর আগে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা এ এস এম মহসীন জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত করে সত্যতা যাচাইপূর্বক প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
লক্ষ্মীপুরের ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা আশা করছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রকৃত রূপ বেরিয়ে আসবে এবং দোষী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


