তিন একর জমির ওপর নির্মিত শিশুপার্কটি যেন এখন এক পরিত্যক্ত স্মৃতিচিহ্ন। প্রায় ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ হওয়ার আগেই উদ্বোধন করা হয় পার্কটির। কিন্তু উদ্বোধনের পরই দেখা দেয় জটিলতা। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে পার্ক নির্মাণের অভিযোগ তুলে স্থানীয় এক ব্যক্তি উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করেন। ফলে চালু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায় পার্কটির কার্যক্রম। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখন ভিড় জমাচ্ছেন রায়পুর উপজেলাসংলগ্ন মেঘনা নদী ভাঙন এলাকায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত তিন বছর ধরে উপজেলার চরপাতা “স্মার্ট গ্রাম”-এর একমাত্র শিশুপার্কটির ফটকে ঝুলছে তালা। দেখভালের অভাবে পার্কের বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে পুরো এলাকাটি। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হওয়ার ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও একটি মানসম্মত বিনোদনকেন্দ্র গড়ে না ওঠায় স্থানীয়দের ক্ষোভ বাড়ছে।
বিনোদনের খোঁজে মানুষ ছুটছেন মেঘনা নদী পাড়ের বিভিন্ন স্থানে। বিশেষ করে সাজু মোল্লার ইলিশা ঘাট, জ্বীনের মসজিদ এলাকা, হায়দরগঞ্জ মাছঘাট, দালাল বাজার খোয়া সাগর দীঘির পাড়, জমিদার বাড়ি, চৌধুরী বাড়ি, মজুচৌধুরী ঘাট ও রামগতি উপজেলাআলেকজান্ডার নদীপাড়ে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সময় যত গড়িয়েছে, বেড়েছে দর্শনার্থীদের সমাগম। কেউ বন্ধুদের নিয়ে, কেউবা পরিবার-স্বজনদের সঙ্গে ছুটে এসেছেন প্রকৃতির টানে।
অভিভাবকদের অনেকেই জানান, সন্তানদের নদী ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই তারা এখানে নিয়ে এসেছেন। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও পরিচর্যার অভাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক দর্শনার্থী।
উপজেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের ভাঙনকবলিত এলাকাতেও ঈদের ছুটিতে মানুষের ভিড় বেড়েছে। সেখানে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্র। নদীর তীরে স্থাপিত রেস্তোরাঁ, নাগরদোলা ও বিভিন্ন অস্থায়ী বিনোদন ব্যবস্থায় ভিড় করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কেউ মাছ ধরার দৃশ্য উপভোগ করছেন, কেউ সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন। অনেকে সেই স্মৃতি ধরে রাখছেন মোবাইল ফোনের ক্যামেরায়। নদীপাড়ে গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁ ও ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতেও দর্শনার্থীদের ভিড়। মুখরোচক খাবার আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—দুই মিলিয়ে জমজমাট পরিবেশ। অনেকে নদীতে নেমে সাঁতার কাটতেও দেখা গেছে।
এলাকাজুড়ে চরবংশী, টুনুরচর, চরইন্দ্রুরিয়া, চরজালিয়া, চরপাঙ্গাসিয়া ও চররমনী এলাকায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
রায়পুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাষ্টার আলতাফ হোসেন হাওলাদার ব্যক্তি উদ্যোগে মেঘনার তীরে বাঁধ নির্মাণ করে বিশাল এলাকাজুড়ে ইলিশ মাছের আড়ৎ স্থাপন করেছিলেন। নদীপাড়ে ঝাউসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো, দর্শনার্থীদের বসার জন্য বেঞ্চ নির্মাণ এবং দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তবে গত দুই বছরে ভয়াবহ নদীভাঙনে এসব স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে।
পাশের চাঁদপুর জেলা চরভৈরবী গ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা প্রবাসফেরত আফজাল মিয়া বলেন,
“মেঘনার তীরের সৌন্দর্যের কথা অনেক শুনেছি। ঈদের দিন পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসে সত্যিই ভালো লাগছে। ছোট ছোট নৌকায় মাছ ধরা দেখে বাচ্চারা খুব আনন্দ পেয়েছে। সূর্যাস্তের দৃশ্য ছিল অপূর্ব।”
জেলা শহর থেকে আসা রুবেল-মারিয়া দম্পতিও মুগ্ধতার কথা জানান। তারা বলেন,
“বিয়ের নয় মাস পর প্রথমবার ঘুরতে এলাম। মেঘনার পাড়ের সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। সমুদ্রসৈকতের আদলে সাজানো পরিবেশ দেখে খুব ভালো লেগেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদির মাঝি জানান, ২০০১ সালের ভয়াবহ ভাঙনে তাদের বাড়ি-ঘর ও দোকানপাট নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে অবশিষ্ট জমিতে নদীর বাঁধসংলগ্ন এলাকায় রেস্তোরাঁ চালু করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। তার ভাষায়,
“ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বাঁধ ও ঘাটের কারণে এলাকাটির চিত্র বদলে গেছে। এখন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক আসছেন।”
শিশুপার্ক প্রসঙ্গে পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আবু নাছের বাবু অভিযোগ করে বলেন,
“খাস জমি উদ্ধারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জমি দখল করেই পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। যথাযথ অধিগ্রহণ হলে বিরোধ মিটে যেত। তিন বছর ধরে পার্কটি বন্ধ। সব সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে, জায়গাটি এখন পরিত্যক্ত।”
এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা প্রশাসন-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার বলেন,
“দীর্ঘদিনেও শহরে একটি মানসম্মত বিনোদনকেন্দ্র গড়ে না ওঠা দুর্ভাগ্যজনক। মেঘনার তীরে ইলিশ ঘাট ও সাজু মোল্লার মাছঘাট এলাকাটি এখন বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ঈদের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। আমিও পরিবার নিয়ে মাঝে মাঝে সেখানে ঘুরতে যাই।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত শিশুপার্কটি চালু করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। আর ততদিন পর্যন্ত ভাঙনপাড়ের প্রকৃতিই হবে রায়পুরবাসীর একমাত্র অবলম্বন।




