ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশনের (ইন্টারপোল) রেড নোটিশভুক্ত নজরুল ইসলাম মোল্লা নামে এক বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করেছে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেফতার ব্যক্তি এখন দেশটির কারাগারে বন্দী। তাঁর গ্রেফতারের বিষয়টি এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে নজরুলের বিরুদ্ধে মানব পাচার, মুক্তিপণ ও হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০২০ সালের মে মাসে লিবিয়ায় মিজদাহতে মানব পাচারকারীদের গুলিতে ২৬ বাংলাদেশি মারা যান। ওই ঘটনায় বাংলাদেশে দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি নজরুল। দীর্ঘ দিন তিনি দেশের বাইরে পালিয়ে ছিলেন। গ্রেফতারের পর এখন তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার পুলিশের একাধিক সূত্র থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২১ সালের নভেম্বরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ছয়জন শীর্ষ মানব পাচারকারীকে ধরিয়ে দিতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছিল। তাদের মধ্যে এই নজরুল ইসলাম অন্যতম। বাকি পাঁচজন হলেন মিন্টু মিয়া, স্বপন, তানজিরুল, জাফর ইকবাল ও শাহাদত হোসেন। নোটিশ জারির ৫ বছর পর নজরুলকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (সিরিয়াস ক্রাইম) বদরুল আলম মোল্লা বলেন, ‘লিবিয়ায় নজরুলকে গ্রেফতারের বিষয়টি আমাদের জানানো হয়েছে। তাঁকে দেশে আনা গেলে মানব পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে।’
গতকাল ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, নজরুলের পরিচয়ে লেখা আছে, তিনি বাংলাদেশের মাদারীপুরের বাসিন্দা। সেখানে তাঁর একটি ছবিও রয়েছে। ১৯৭৭ সালের ৪ মে তাঁর জন্ম। অভিযোগের ব্যাপারে ইন্টারপোল লিখেছে– অবৈধ লাভের উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ও প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধভাবে আটকে রেখে এবং মুক্তিপণ চেয়ে হত্যার সঙ্গে যুক্ত তিনি।
গতকাল পর্যন্ত ইন্টারপোলের সাইটে রেড নোটিশভুক্ত বাংলাদেশি ৫৯ জন নাগরিকের একটি তালিকা রয়েছে। সেখানে মানব পাচারকারী নজরুল ছাড়া আরও তিনজনের ব্যাপারে তথ্য রয়েছে। রেড নোটিশধারী ওই তিন মানব পাচারকারী হলেন–কিশোরগঞ্জের মিন্টু মিয়া, একই এলাকার তানজিরুল ও স্বপন।
সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ দলের একজন কর্মকর্তা জানান, এর আগে ২০১৯ সালে ইন্টারপোল রেড নোটিশভুক্ত দুই বাংলাদেশি মানব পাচারকারী গ্রেফতার হয়েছেন। তাঁদের একজন কিশোরগঞ্জের জাফর ইকবাল ইতালি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। আরেকজন মাদারীপুরের শাহাদত হোসেন ঢাকায় গ্রেফতার হয়েছেন।
লিবিয়ার মিজদাহতে বাংলাদেশিদের হত্যা, মুক্তিপণ আদায় ও নির্যাতনের ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে পল্টন ও বনানীতে তিনটি মামলা করেছিল। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আরও ২৩টি মামলা হয়। এসব মামলায় আসামি হয়েছেন ২৯৯ জন।
সিআইডির তথ্য মতে, মানব পাচারের ঘটনায় মামলার সংখ্যা বাড়ছে। ২০২৫ সালে মামলা হয়েছে ১২২টি, ২০২৪ সালে ১০০, ২০২৩ সালে ৮৬ ও ২০২২ সালে ১১৪টি। গত ৫ বছরে সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ টিমের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন ৩৪৪ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাগ্য বদলাতে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাত্রায় দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে দেশ ছাড়ছেন অনেক বাংলাদেশি তরুণ। নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়েও তাদের অধিকাংশ মারা যাচ্ছেন। মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের পর লিবিয়া থেকে ইতালির উদ্দেশে ভূমধ্যসাগরে কোনোরকম একটি কাঠের নৌকায় তুলে দিয়ে দায় সারে দালালরা। এ কাজটিকে তারা বলে ‘গেমিং’। যাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে, তারা এই গেমিংয়ের হোতা। এমন আরও কয়েকজন গেমিং হোতার তথ্য পাওয়া গেছে।
৬ বছর আগে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে মিজদা শহরের একটি ক্যাম্পে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়। এতে আহত হন আরও ১২ জন। এ ঘটনায় দায়ের ২৫টি মামলার তদন্ত করেছে সিআইডি। সিআইডির অনুরোধে ইন্টারপোলে এই রেড নোটিশ জারির সুপারিশ করে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। এখন পর্যন্ত রেড নোটিশভুক্ত তিনজনকে গ্রেফতার করা গেছে। বাকিদের অবস্থান ও গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মাদারীপুরকেন্দ্রিক মানব পাচারকারী দলের অন্যতম প্রধান সদস্য নজরুল ইসলাম মোল্লা, জাফর ও শাহাদত। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশে ভালো চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে প্রতারণা, মুক্তিপণের দাবিতে জিম্মি করা এবং হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১ জুন লিবিয়া থেকে ১৭৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফেরেন। লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লিবিয়া সরকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
প্রত্যাবাসিত বাংলাদেশিদের বেশির ভাগই সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপ গমনের উদ্দেশ্যে মানব পাচারকারীদের প্ররোচনায় ও সহযোগিতায় লিবিয়ায় অনুপ্রবেশ করেন বলে জানা যায়। তাদের অনেকে লিবিয়ায় বিভিন্ন সময়ে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
লিবিয়ায় বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।


